ফুটবল বিশ্বের চোখ এখন আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে। ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর দ্বিতীয় সেমিফাইনালে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও সাবেক চ্যাম্পিয়ন ইংল্যান্ড। বুধবার বাংলাদেশ সময় রাত ১টায় শুরু হতে যাওয়া এ হাইভোল্টেজ ম্যাচটিকে ঘিরে বিশ্বজুড়ে চড়ছে উত্তেজনার পারদ। মাঠের দ্বৈরথ শুরুর আগেই জার্সির মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ, টিকিট নিয়ে হাহাকার এবং দুই দলের অধিনায়ক ও কোচের রণকৌশল ম্যাচটিকে রূপ দিয়েছে শতাব্দীর অন্যতম সেরা লড়াইয়ে।
নীল জার্সির ‘টোটকা’ ও মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ
মাঠের লড়াইয়ের আগেই প্রথম মনস্তাত্ত্বিক জয়টি তুলে নিয়েছে আলবিসেলেস্তেরা। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচে নিজেদের ঐতিহ্যবাহী আকাশী-সাদা জার্সির বদলে গাঢ় নীল রঙের অ্যাওয়ে কিট পরে খেলার জন্য ফিফার কাছে বিশেষ অনুরোধ জানিয়েছিল আর্জেন্টিনা (এএফএ)। ফিফা সেই অনুরোধ মঞ্জুর করায় লিওনেল স্কালোনির দল নামবে নীল জার্সিতে।
১৯৮৬ এবং ১৯৯৮ বিশ্বকাপে যখনই আর্জেন্টিনা ইংল্যান্ডকে হারিয়েছে, তখনই তাদের গায়ে ছিল এই গাঢ় নীল জার্সি। ১৯৮৬ সালের সেই ম্যাচেই ফুটবল ঈশ্বর ডিয়েগো ম্যারাডোনা উপহার দিয়েছিলেন বিখ্যাত ‘হ্যান্ড অব গড’ ও ‘গোল অব দ্য সেঞ্চুরি’। অন্যদিকে, ১৯৬৬ ও ২০০২ বিশ্বকাপে হোম কিট পরে ইংলিশদের কাছে হেরেছিল আর্জেন্টিনা। সেমিফাইনালের মহারণে তাই এ নীল জার্সিকেই নিজেদের ‘লাকি চার্ম’ মানছেন আর্জেন্টাইন সমর্থকরা। বিপরীতে, টমাস টুখেলের ইংল্যান্ড মাঠে নামবে সম্পূর্ণ সাদা পোশাক বা ‘অল-হোয়াইট’ কিট পরে।
মাঠের লড়াইয়ে অধিনায়কদের হুঙ্কার
ম্যাচকে ঘিরে মাঠের বাইরের নানা আলোচনা ও ড্রেসিংরুমের আবহাওয়া নিয়ে মুখ খুলেছেন দুই দলের দলনেতা। ইংল্যান্ড শিবিরে কোচের মন্তব্যের বিপরীতে বেলিংহ্যামের প্রতিক্রিয়া নিয়ে যে গুঞ্জন তৈরি হয়েছিল, তা শক্ত হাতে উড়িয়ে দিয়েছেন ইংলিশ অধিনায়ক হ্যারি কেইন। বিবিসি স্পোর্টকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি দলের ঐক্যের ওপর জোর দিয়ে বলেন, "ম্যাচ শেষের গরম উত্তেজনার মাথায় জুডকে (বেলিংহ্যাম) প্রশ্ন করা হয়েছিল। আমাদের দলে কোনো বিভক্তি নেই। বরং আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে আমরা বেশি ঐক্যবদ্ধ। বড় টুর্নামেন্টে ইংল্যান্ডকে নিয়ে এ ধরনের নেতিবাচক গল্প বানানো সংবাদমাধ্যমের একটা পুরনো অভ্যাস। বাস্তবতা হলো, শুধু খেলোয়াড়রা নয়, কোচিং স্টাফসহ পুরো দল একসঙ্গে কাজ করছে। আর্জেন্টিনার মতো শক্তিশালী দলের বিপক্ষে জিততে হলে এ ঐক্যই আমাদের মূল শক্তি হবে।"
অন্যদিকে, বিশ্বমঞ্চে নিজের সম্ভাব্য শেষ টুর্নামেন্টে আরও একটি ফাইনালের স্বপ্ন দেখছেন আর্জেন্টিনার মহাতারকা ও অধিনায়ক লিওনেল মেসি। ম্যাচটি নিয়ে নিজের অনুভূতি প্রকাশ করে তিনি বলেন, "ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলা সবসময়ই বিশেষ কিছু। তাদের দলে দুর্দান্ত কিছু প্রতিভাবান খেলোয়াড় রয়েছে যারা যেকোনো মুহূর্তে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারে। জার্সির রঙ বা অতীত ইতিহাসের চেয়ে আমাদের ফোকাস মাঠের ৯০ মিনিটের ওপর। আমরা জানি পুরো আর্জেন্টিনা এবং বিশ্বজুড়ে কোটি ভক্ত আমাদের দিকে তাকিয়ে আছেন। আমরা আবেগ ধরে রেখে শান্ত মাথায় নিজেদের সেরা ফুটবলটা খেলতে চাই, যেন আরও একবার বিশ্বমঞ্চের ফাইনালে দেশের পতাকা ওড়াতে পারি।"
দুই কোচের রণকৌশল
দুই দলের ড্রেসিংরুমের আবহে রয়েছে ভিন্ন সুর। তবে মাঠের লড়াই নিয়ে দুজনেই বেশ সতর্ক। ইংল্যান্ডের মাস্টারমাইন্ড কোচ টমাস টুখেল প্রেস কনফারেন্সে নিজের লক্ষ্যের কথা স্পষ্ট করে বলেন, "আর্জেন্টিনা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন এবং তারা জানে কীভাবে বড় ম্যাচ জিততে হয়। মেসি যেকোনো মুহূর্তে ম্যাচের ভাগ্য বদলে দিতে পারেন। তবে আমাদের দলের শক্তিতে আমার পূর্ণ আস্থা আছে।"
অন্যদিকে, মাঠের বাইরের ইতিহাস বা জার্সির কুসংস্কারের চেয়ে মাঠের পারফরম্যান্সকেই এগিয়ে রাখছেন আর্জেন্টিনার মাস্টারমাইন্ড কোচ লিওনেল স্কালোনি। প্রতিপক্ষকে সমীহ করে তিনি বলেন, "জার্সির রঙ বা অতীত ইতিহাস আমাদের বাড়তি অনুপ্রেরণা দিতে পারে, তবে তা ম্যাচ জেতাবে না। ইংল্যান্ড দলে হ্যারিকেন বা বেলিংহ্যামের মতো ম্যাচ উইনাররা আছেন। আমাদের লক্ষ্য নিখুঁত ফুটবল খেলে টানা দ্বিতীয়বার ফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করা।"
ফকল্যান্ডের ছায়া ও টিকিটে আগুন
আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড ফুটবল ম্যাচ মানেই ইতিহাসের পাতা ওল্টানো। ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড দ্বীপপুঞ্জের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর থেকে এই দুই দলের ফুটবলীয় লড়াই রূপ নিয়েছে জাতীয় মর্যাদার লড়াইয়ে। ম্যারাডোনা স্বয়ং তার আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয় ছিল ফকল্যান্ড যুদ্ধের এক পাক্ষিক প্রতিশোধ। বহু বছর পর আবারও সেই ভূ-রাজনৈতিক আবেগ ফিরে আসছে ফুটবল মাঠে।
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে বিশ্বমঞ্চে লিওনেল মেসির আবেগঘন বিদায়-লগ্নের সমীকরণ। এই মহামূল্যবান মুহূর্তটির সাক্ষী হতে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে টিকিট নিয়ে কাড়াকাড়ি পড়ে গেছে। অফিশিয়াল রিসেল প্ল্যাটফর্মে সবচেয়ে কমদামি ‘ক্যাটাগরি ৩’ টিকিটের দামই ঠেকেছে ২ হাজার '৬০০ ডলারে (প্রায় ৩ লাখ টাকা)। আর ভিআইপি বা সর্বোচ্চ ক্যাটাগরির টিকিটের দাম হাঁকা হচ্ছে আকাশচুম্বী ১ লাখ ৫০ হাজার ডলার!
রেফারিংয়ের ওপর কড়া নজর
চলতি বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার ম্যাচগুলোতে রেফারিং নিয়ে শেষ ষোলোতে মিসর এবং কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ড অসন্তোষ প্রকাশ করেছিল। ফলে এই হাইপ্রোফাইল ম্যাচের রেফারি কে হচ্ছেন, তা নিয়ে ছিল বাড়তি কৌতূহল। ফিফা এই ম্যাচের দায়িত্ব দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের অভিজ্ঞ রেফারি ইসমায়েল এলফাতকে। ৪৪ বছর বয়সী এলফাত ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের ফাইনালে চতুর্থ রেফারি ছিলেন। তার সহকারী হিসেবে থাকবেন কোরি পার্কার ও কাইল অ্যাটকিনস।