ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক মন্তব্যে বাংলাদেশ, একটি বহুল আলোচিত হত্যাকাণ্ড এবং এমন কিছু ইঙ্গিত উঠে এসেছে-যা দু’দেশের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মধ্যে নতুন করে প্রশ্ন তৈরি করেছে। ঘটনার সূত্রপাত কলকাতার ধর্মতলায় এক রাজনৈতিক কর্মসূচিতে দেওয়া বক্তব্য থেকে। সেখানে পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্সের প্রশংসা করতে গিয়ে তিনি উল্লেখ করেন, বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে আসা একজন “আলোচিত খুনি”কে গ্রেফতার করা হয়েছিল, যে খুনটি নিয়ে বাংলাদেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছিল। একইসঙ্গে তিনি বলেন, কারা খুন করিয়েছিল এবং কার কার নাম বেরিয়ে এসেছিল, তা তিনি জানেন। সরকার বদলে গেলেও সে তথ্য তার জানা আছে বলেও তিনি দাবি করেন। বক্তব্যে তিনি আরও ইঙ্গিত দেন যে অভিযুক্তরা মেঘালয় হয়ে পশ্চিমবঙ্গে প্রবেশ করেছিল এবং সেখান থেকে তাদের আটক করা হয়।

এ মন্তব্যের পর বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পুনরায় চলে আসে ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ড। কারণ চলতি বছরের মার্চ মাসেই পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের স্পেশাল টাস্ক ফোর্স বাংলাদেশে সংঘটিত ওই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগে কয়েকজন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করেছিল। তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল, তারা মেঘালয় সীমান্ত ব্যবহার করে ভারতে প্রবেশ করেছিল। পরবর্তীতে আরও একজন সন্দেহভাজনকে পশ্চিমবঙ্গের নদীয়া জেলা থেকে আটক করা হয়। এর আগে বাংলাদেশের গোয়েন্দা সংস্থাও তাদের একজনকে হত্যাকাণ্ডের মূল অভিযুক্ত হিসেবে চিহ্নিত করেছিল। এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি উঠে আসে। যদি সত্যিই ওই বক্তব্য ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে হয়ে থাকে, তাহলে একজন ভারতীয় রাজনীতিক কী এমন তথ্যের ইঙ্গিত দিচ্ছেন যা জনসমক্ষে এখনো পুরোপুরি প্রকাশিত হয়নি?

এখানেই বিষয়টি নতুন মাত্রা পায়। দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে পারস্পরিক সন্দেহ, অভিযোগ এবং অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে প্রতিবেশী দেশের প্রসঙ্গ টেনে আনার সংস্কৃতি নতুন নয়। বাংলাদেশ যেমন নানা সময়ে ভারতের রাজনৈতিক বক্তব্যে আলোচিত হয়, তেমনি ভারতের বিভিন্ন রাজ্য ও কেন্দ্রীয় রাজনীতিতেও বাংলাদেশ একটি আলোচিত বিষয়। কিন্তু যখন কোনো হত্যাকাণ্ড, সীমান্ত পেরিয়ে পলাতক আসামী, গোয়েন্দা তৎপরতা এবং রাজনৈতিক ইঙ্গিত একই আলোচনায় এসে যায়, তখন বিষয়টি আর কেবল রাজনৈতিক বক্তৃতার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। একই কারণে ওসমান হাদির হত্যার ঘটনাটিও সাধারণ একটি হত্যাকাণ্ড হিসেবে বিবেচিত হয়নি। গত বছরের ডিসেম্বরে গুলিবিদ্ধ হওয়ার পর চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি মারা যান। ইনকিলাব মঞ্চ নামক একটি রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে ওসমান হাদি নিজের কার্যক্রম পরিচালনা করছিলেন। ফলে তার মৃত্যু স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক কিছু প্রশ্নও উত্থাপন করে।

মমতা যেসব অভিযোগ তুলেছেন সেগুলোর সত্যতা বিচারিক তদন্তের বিষয়। তবে রাজনৈতিক বিবেচনায় একটি ভিন্ন বাস্তবতাও আছে। ওসমান হাদি আজ কেবল একজন নিহত ব্যক্তির নাম নন; তিনি পরিণত হয়েছেন একটি রাজনৈতিক প্রতীকে। আর রাজনৈতিক প্রতীক হয়ে গেলে একজন মানুষের মৃত্যু বিভিন্ন পক্ষের জন্য ভিন্ন ভিন্ন অর্থ বহন করে। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, বাংলাদেশ সরকার পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মূখ্যমন্ত্রীর মন্তব্যের ব্যাপারে খুবই সংযত প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ জানিয়েছেন, ‘ভারতের অভ্যন্তরে একটি নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থীর মন্তব্য বাংলাদেশ আমলে নিচ্ছে না। হাদি হত্যা ও অন্য দেশের কোনো রাজনৈতিক নেতার বক্তব্য বাংলাদেশের আলোচনার বিষয় নয় বলে তিনি মন্তব্য করেন। পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষণীয়। তিনি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে মূলত অন্য দেশের একজন রাজনৈতিক নেতা বা নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থী হিসেবে দেখার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মমতা কোনো সাধারণ রাজনৈতিক কর্মী নন। তিনি টানা প্রায় দেড় দশক পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছেন এবং যে সময়কার ঘটনার প্রতি তিনি ইঙ্গিত করেছেন, সে সময়ও তিনি সে পদেই অধিষ্ঠিত ছিলেন। ফলে তার বক্তব্যকে নিছক নির্বাচনী বাগাড়ম্বর বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তার বক্তব্যে শুধু কোনো অনুমান বা রাজনৈতিক অভিযোগ করেননি বরং তিনি সরাসরি দাবি করেছেন যে ভারতের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাকে এ বিষয়ে নীরব থাকতে বলেছিলেন। এ দাবি সত্য হলে তা শুধু একটি হত্যাকাণ্ডের তদন্তের প্রশ্ন নয়, বরং দু’দেশের নিরাপত্তা, গোয়েন্দা সহযোগিতা এবং আন্তঃরাষ্ট্রীয় অপরাধ মোকাবিলার বিষয়কেও স্পর্শ করে। আর দাবি মিথ্যা হলে সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তখন ভারতের দু’শীর্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের মধ্যে প্রকাশ্য বিরোধপূর্ণ বক্তব্যের বিষয়টি সামনে চলে আসে। এ কারণে মমতা কী বলছেন সে প্রশ্নের চেয়ে তিনি কোন অবস্থান থেকে বলেছেন এবং তার বক্তব্যে উত্থাপিত অভিযোগের গুরুত্ব কতটুকু তা নিশ্চিত হওয়া বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের দায়িত্ব হওয়া উচিত ছিল বিষয়টিকে আবেগ দিয়ে নয়, বরং রাষ্ট্রীয় স্বার্থের দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা। অন্তত কূটনৈতিক পর্যায়ে ব্যাখ্যা চাওয়া বা তথ্য জানতে আগ্রহ প্রকাশ করলেও অস্বাভাবিক কিছু হতো না।

হাদি হত্যাকাণ্ড এমনিতেই বহু প্রশ্নে ঘেরা একটি ঘটনা। হত্যার পর সন্দেহভাজনদের সীমান্ত অতিক্রম, ভারতের বিভিন্ন এলাকায় গ্রেপ্তার, পশ্চিমবঙ্গ পুলিশের সম্পৃক্ততা এবং ভারতের প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতাদের পরস্পরবিরোধী বক্তব্য ঘটনাটিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এমন পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে অতিরিক্ত সতর্কতা বা নীরবতাকে অনেকেই বড়ো কোনো রহস্য এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা হিসেবেই গন্য করছেন। দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে বহু বছর ধরেই এ মানসিকতা লক্ষ্য করা গেছে। প্রতিবেশী কোনো শক্তিশালী রাষ্ট্রকে ঘিরে প্রশ্ন উঠলে আমরা প্রায়ই বিষয়টিকে গুরুত্বহীন প্রমাণ করার চেষ্টা করি। অথচ একটি আত্মমর্যাদাশীল রাষ্ট্রের আচরণ হওয়া উচিত ভিন্ন। ব্যাখ্যা চাওয়া মানে শত্রুতা নয়, প্রশ্ন তোলা মানেও কূটনৈতিক সম্পর্ক নষ্ট করা নয়, আর জাতীয় স্বার্থের বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান নেওয়া কোনোভাবেই উগ্রতা নয়।

বিষয়টি সাম্প্রতিক আরেকটি দৃষ্টান্ত দিয়েও প্রমাণ করা যায়। হাদি হত্যা নিয়ে যখন বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বাক্য বিনিময় চলছে ঠিক সে সময়েই সীমান্তে ভারতীয় বিএসএফ’র হাতে বাংলাদেশী নাগরিকদের মৃত্যু নিয়ে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী একটি মন্তব্য করেছেন যা নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। তিনি বলেছেন, “অবৈধ অনুপ্রবেশ বা অপরাধে জড়িত কোনো ব্যক্তি অন্য দেশের ভূখণ্ডে গিয়ে নিহত হলে সেটিকে ‘সীমান্ত হত্যা’ বলা ঠিক নয়। তার মতে, সীমান্তরক্ষী বাহিনী নিজ দেশের আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়ার অধিকার রাখে। কেবল তখনই ‘সীমান্ত হত্যা’ বলা যেতে পারে, যখন জিরো লাইন বা সীমান্ত অতিক্রম করে অন্য দেশের বাহিনী বাংলাদেশের ভূখণ্ডে প্রবেশ করে কাউকে হত্যা করে।”

আইনগত পরিভাষার দিক থেকে এ বক্তব্যের একটি ব্যাখ্যা থাকতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, সীমান্তে প্রাণহানির বিষয়টি কি শুধুই পরিভাষাগত বিতর্কের মধ্যে সীমাবদ্ধ? নাকি এর সঙ্গে মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন, ন্যায়বিচার এবং রাষ্ট্রের নাগরিক সুরক্ষার দায়বদ্ধতাও জড়িত? সীমান্তে নিহত ব্যক্তিদের সবাই নির্দোষ ছিলেন, এমন দাবি কেউ করে না। আবার এটাও সত্য যে, কেউ অপরাধে জড়িত থাকলেই তাকে বিচারবহির্ভূতভাবে হত্যা করার অধিকার কোনো রাষ্ট্র বা বাহিনী পেয়ে যায় না। সভ্য রাষ্ট্রব্যবস্থার মৌলিক নীতি হলো, অপরাধের অভিযোগ থাকলে গ্রেপ্তার করা হবে, বিচার হবে, তারপর আদালত শাস্তি নির্ধারণ করবে। সীমান্তে সন্দেহভাজন বা অনুপ্রবেশকারীদের গুলি করে হত্যা করা উপরোক্ত নীতির সঙ্গে মোটেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

অনেক সময় দেখা যায়, সীমান্তে নিহত ব্যক্তির বিরুদ্ধে পরবর্তীতে চোরাচালান, অনুপ্রবেশ বা অন্য কোনো অপরাধের অভিযোগ আনা হয়। কিন্তু অভিযোগ আর অপরাধ প্রমাণ এক বিষয় নয়। যদি আইনই চূড়ান্ত মানদণ্ড হয়, তাহলে আইনের পূর্ণ প্রক্রিয়াও অনুসরণ করতে হবে। বিচার ছাড়া প্রাণহানি ঘটলে সেটি নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্যেও দেশের সচেতন সমাজ মূলত এখানেই আপত্তি তুলছেন। তাদের আশঙ্কা, এ ধরনের বক্তব্য সীমান্তে প্রাণঘাতী শক্তি ব্যবহারের ঘটনাকে পরোক্ষভাবে স্বাভাবিক বা গ্রহণযোগ্য হিসেবে উপস্থাপন করতে পারে। বিশেষ করে যখন বছরের পর বছর ধরে সীমান্তে বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হওয়ার ঘটনা দুই দেশের সম্পর্কের একটি সংবেদনশীল ইস্যু হিসেবে বিদ্যমান, কিংবা হুট করেই বাংলাদেশের বিভিন্ন সীমান্ত দিয়ে ভারতের জোরপূর্বক পুশ-ইনের চেষ্টা বৃদ্ধি পাচ্ছে-এরকম স্পর্শকাতর সময়ে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ের বক্তব্য অত্যন্ত সতর্ক ও ভারসাম্যপূর্ণ হওয়া প্রয়োজন।

সীমান্তে নিহত ব্যক্তি অপরাধী ছিলেন কি না, সেটি একটি আলাদা প্রশ্ন। কিন্তু তিনি বাংলাদেশের নাগরিক কি না, তা রাষ্ট্রের জন্য একটি মৌলিক প্রশ্নই হয়ে উঠতে পারে। একজন নাগরিক দেশের ভেতরে থাকুন বা সীমান্তে, রাষ্ট্রের দায়িত্ব তার জীবন ও অধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করা। কোনো নাগরিক অপরাধ করলে তার বিচারের দাবি করা যেতে পারে, কিন্তু বিচার ছাড়া হত্যাকে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ঠিক একইরকম ইনসাফ ওসমান হাদির হত্যা নিয়েও করা জরুরি। হাদি হত্যাকাণ্ডের বিচার বাংলাদেশের জনগণের দাবি। সরকারও বলছে তারা বিচার চায় এবং ভারতে আটক সন্দেহভাজনদের ফিরিয়ে আনার জন্য চেষ্টা চলমান রয়েছে। কিন্তু এ দাবি অসাড় হয়ে যায় যখন সরকারের শীর্ষ ব্যক্তিরা এ হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্য সামনে এলে সেটিকে একেবারে গুরুত্বহীন বলে উড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন। কারণ অনেক সময় তথ্যের অভাব নয়, বরং তথ্যকে গুরুত্ব না দেওয়ার প্রবণতাই সত্য উদঘাটনের পথে সবচেয়ে বড়ো বাধা হয়ে দাড়ায়।

রাষ্ট্রের মর্যাদা নীরবতা দিয়ে নয় বরং আত্মবিশ্বাস দিয়েই সুরক্ষিত হয়। আর আত্মবিশ্বাসী রাষ্ট্র প্রশ্ন করতে ভয় পায় না। বরং প্রয়োজন হলে বন্ধু রাষ্ট্রের কাছেও স্পষ্ট জবাব চায়। কারণ জাতীয় স্বার্থ, বিচার এবং সত্যের প্রশ্নে কোনো রাষ্ট্রেরই নতজানু থাকার সুযোগ নেই। হাদি হত্যাকাণ্ডের ঘটনার আরেকটি দিকও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। হত্যাকাণ্ডের পর অভিযুক্তদের সীমান্ত অতিক্রম করে অন্য দেশে প্রবেশ এবং সেখান থেকে গ্রেফতারের ঘটনা সার্বিকভাবে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এসব ঘটনা প্রমাণ করেছে যে, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা কাঠামোর দুর্বলতা নিয়ে নতুন করে ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। যদি উচ্চপর্যায়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে যায়; তাহলে সাধারণ নাগরিকের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়াটা মোটেও অস্বাভাবিক নয়।

মমতা বন্দোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক মন্তব্যের সত্যতা বা উদ্দেশ্য যাই হোক না কেন, তা বাংলাদেশকে নতুন করে তিনটি প্রশ্নের মুখোমুখি করেছে। প্রথমত, ওসমান হাদি হত্যাকাণ্ডের পূর্ণ সত্য কি এখনো জনসমক্ষে আসেনি? দ্বিতীয়ত, এ হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কোনো রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ কাজ করেছে কি না? তৃতীয়ত, বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগেই বিভিন্ন পক্ষ কি নিজেদের রাজনৈতিক সুবিধা অনুযায়ী ঘটনাটিকে ব্যবহার করছে?

এ প্রশ্নগুলোর উত্তর রাজনৈতিক বক্তৃতা থেকে পাওয়া যাবে না। উত্তর দিতে হবে তদন্ত সংস্থাকে, আদালতকে এবং রাষ্ট্রকে। কারণ শুধু অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিত করার জন্যই নয়; বরং গুজব, সন্দেহ, রাজনৈতিক অপব্যবহার এবং বিদেশি ইঙ্গিতনির্ভর আলোচনার অবসান ঘটানোর জন্যও এ হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু বিচার হওয়া প্রয়োজন। এক্ষেত্রেও বিদ্যমান বাস্তবতা নিতান্তই হতাশাজনক। শরিফ ওসমান বিন হাদি হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে সিআইডি বারবার ব্যর্থ হওয়ায় এবং প্রধান আসামীরা ভারতে গ্রেপ্তার হওয়ায় বিচার প্রক্রিয়ায় অপ্রত্যাশিতভাবে বিলম্ব ঘটছে। তাছাড়া মামলার বাদী নারাজি (অসম্মতি) আবেদন দেওয়ায় আদালত সিআইডিকে অধিকতর তদন্তের নির্দেশ দিয়েছেন। এর সময়সীমাও একাধিকবার বাড়ানো হয়েছে। আবার প্রধান সন্দেহভাজন অভিযুক্ত ফয়সাল করিম মাসুদ এবং তার সহযোগী আলমগীর হোসেন ভারতের পশ্চিমবঙ্গে গ্রেপ্তার হওয়ার পরও তাদের ফিরিয়ে আনার ক্ষেত্রেও কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাচ্ছে না। এ মন্থরতা হাদি হত্যার বিচারে সরকারের আন্তরিকতা নিয়েই জনমনে প্রশ্নের উদ্রেক করছে।

এ প্রেক্ষাপটে বর্তমানে সবচেয়ে জরুরি বিষয় হলো, কে কী বললেন তা নয়; বরং কে হত্যা করল, কেন করল এবং কারা এর মাধ্যমে লাভবান হলো, সে সত্যকে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জাতির সামনে তুলে ধরা। সত্য প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত ওসমান হাদির মৃত্যু বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিতর্কের কেন্দ্রেই থেকে যাবে, আর প্রতিটি নতুন মন্তব্য সেই বিতর্ককে আরও জটিল করে তুলবে। আর ক্ষমতাসীন সরকার নতুন হলেও তাদেরকেও অনুধাবন করতে হবে যে, দিল্লী না ঢাকা শ্লোগান দিয়ে ভারতের একচ্ছত্র হেজিমনির বিরুদ্ধে যে জুলাই অভ্যুত্থান হয়েছিল তারই ফলশ্রুতিতে তারা আজ ক্ষমতায়। তাই পূর্ববর্তী ফ্যাসিস্ট সরকারের মতো ভারতকে তোষণনীতি জনগণ আর মেনে নেবে না। জনগণ প্রতিবেশী দেশ হিসেবে ভারতের সাথে ইতিবাচক সম্পর্ক বজায় রাখার পক্ষে; তবে নতজানু কোনো নীতি বা কৌশল তারা আর দেখতে চায় না।