জসিম উদ্দিন মনছুরি
দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষার বিকল্প নেই। আধুনিক যুগে বহি:শত্রুর আক্রমণ রুখে দেওয়ার জন্য আকাশ প্রতিরক্ষা সিস্টেম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যে দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা সিস্টেম যত শক্তিশালী সেই দেশ ততই নিরাপদ। বর্তমানের যুদ্ধ স্থল যুদ্ধে সীমাবদ্ধ থাকে না। যার বাস্তব প্রতিফলন ঘটেছে সাম্প্রতিক ঘটে যাওয়া ইরান ও আমেরিকা-ইসরাইল যুদ্ধে। ইরানী শক্তিশালী মিসাইল ব্যবস্থার কাছে পরাশক্তি আমেরিকা ও ইসরাইল নতি স্বীকারে বাধ্য হয়েছে। ইরানের মিসাইল শত্রু দেশের ঘাটি,লক্ষ্যবস্তু রাডারকে ফাঁকি দিয়ে লক্ষ্যবস্তুতে যথাযথভাবে আঘাত হানতে সক্ষম হয়েছে। আবার ইরানের প্রতিরক্ষা সিস্টেমের কাছে বিলিয়ন ডলারের যুদ্ধবিমান পরাস্ত হতে বাধ্য হয়।
পৃথিবীর দেশ গুলো যখন অস্ত্রের খেলায় মেতে উঠেছে তখন দেশের আকাশ প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করা সময়োচিত বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। এ লক্ষ্যে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার খানিকটা এগিয়েছিল যা দেশের জনগণকে আশান্বিত করে তুলে। বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যেখানে ভারত সীমান্তে অহরহ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছিল সেখানে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কঠিন পদক্ষেপে সীমান্ত হত্যা কিছুটা হলেও হ্রাস পেয়েছিল। বিএসএফ বিজিবির কাছে নতি স্বীকারে বাধ্য হয়েছিল । সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের উস্কানিতে বিএসএফ অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের পুশইন চেষ্টা করে যাচ্ছে। কিন্তু বিজিবির সাহসিকতার কারণে তাদের পুশইনের ষড়যন্ত্র ভেস্তে যাচ্ছে। আমাদের তিন পাশে ভারত অবস্থিত হওয়ায় ভারতের উগ্রবাদীরা যেকোনো সময় বাংলাদেশ দখলের হুমকি প্রদান করে। যা দেশের সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি স্বরূপ। স্বাধীন দেশের ওপর এভাবেই অবৈধ হস্তক্ষেপ আন্তর্জাতিক আইনের সম্পূর্ণ পরিপন্থী।
এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য আমাদের প্রতিরক্ষা বাজেট বৃদ্ধি এবং প্রতিরক্ষা সিস্টেমে পরিবর্তন আনা অত্যন্ত জরুরি। যদিও বিগত বছর গুলোর চেয়ে এবারের প্রতিরক্ষা বাজেট কিছুটা হলেও বৃদ্ধি পেয়েছে। যা প্রশংসার দাবি রাখে। ১১ জুন বিকেলে জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব উপস্থাপন করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি গণতান্ত্রিক, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির অভিযাত্রায় আগামী অর্থবছরের জন্য ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেশ করেন। ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেটে প্রতিরক্ষা খাতে মোট ৪২ হাজার ২৯১ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সংশোধিত বাজেটের (৪০ হাজার ৫০২ কোটি টাকা) তুলনায় ১ হাজার ৫৯৩ কোটি টাকা বেশি। বরাদ্দে পরিচালন ব্যয় (প্রতিরক্ষা সার্ভিস): ৩৮ হাজার ৭২১ কোটি টাকা।উন্নয়ন ব্যয় (প্রতিরক্ষা সার্ভিস): ১ হাজার ৬১১ কোটি টাকা। অন্যান্য সার্ভিস ও মন্ত্রণালয়: পরিচালন ব্যয় বাবদ ১ হাজার ৯১৫ কোটি টাকা। সশস্ত্র বাহিনী বিভাগ: পরিচালন ব্যয় বাবদ ৪৪ কোটি টাকা। যা ২০২৫-২৬ অর্থবছর থেকে বাজেট বৃদ্ধি: ১,৫৯৩ কোটি টাকা, শতাংশের হার: ৩.৯% (সংশোধিত বরাদ্দের ওপর ভিত্তি করে) এবং ৪.৫% (অন্যান্য হিসাব অনুযায়ী)।বার্ষিক বরাদ্দ ও তুলনামূলক খাতের তথ্য- ২০২৪-২৫ অর্থবছর: ৩৯,৪১৫ কোটি টাকা যা পূর্ববর্তী ২০২৩-২৪ অর্থবছর থেকে ৩.১% হ্রাস।২০২৫-২৬ অর্থবছর: ৪০,৬৬১ কোটি টাকা পূর্ববর্তী ২০২৪-২৫ অর্থবছর থেকে ৪.৫% বৃদ্ধি।
বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনীর বর্তমান অবস্থা হল :বিমান বাহিনীর হাতে আছে ৪৪টি যুদ্ধবিমান, যার মধ্যে ৩৬টি চীনের তৈরি পুরনো মডেলের এফ-৭ ও ৮টি সোভিয়েত যুগের মিগ-২৯। প্রশিক্ষণ কাজে ব্যবহৃত রুশ ইয়াক-১৩০ যুদ্ধবিমান ১৪টি, যা হালকা আক্রমণেও ব্যবহারযোগ্য। এসব বিমানের অনেকগুলোই দ্বিতীয় বা তৃতীয় প্রজন্মের, যার ফলে এরা আধুনিক স্টিলথ বা রাডার-অ্যাভাসিভ প্রযুক্তির মুখোমুখি হলে অকার্যকর হতে পারে। বিমানবাহিনীর বহরে হেলিকপ্টার রয়েছে ৭৩টি। এর মধ্যে রাশিয়ার এমআই সিরিজের ৩৬টি হেলিকপ্টার আছে। সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে নির্মিত সেসনা, বেলের বিভিন্ন মডেলের হেলিকপ্টার আছে ২৪টি।গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ারের তথ্য বলছে, বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর কাছে রয়েছে ৩২০টি ট্যাংক। এছাড়া বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর কাছে সব মিলিয়ে ৪৬৪টি কামান রয়েছে বলে জানিয়েছে গ্লোবাল ফায়ার পাওয়ার। এর মধ্যে স্বয়ংক্রিয় কামান রয়েছে ২৭টি। বাংলাদেশের অ্যান্টি এয়ার ক্রাফট গান বা বিমান বিধ্বংসী কামানের উৎস দুটি দেশ। এর মধ্যে সুইজারল্যান্ডের একটি এবং চীনের চারটি সিরিজের কামান রয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশের সামরিক বাহিনীর কাছে মাল্টিপল রকেট লঞ্চার সিস্টেম (এমএলআরএস) আছে ৭৭টি। এর মধ্যে চীনের তৈরি ৪৯টি এবং তুরস্কের দুই ধরনের মোট ২৮টি এমএলআরএস রয়েছে ।
বাংলাদেশের আকাশ প্রতিরক্ষায় সবচেয়ে বড় যে ফাঁকটি হলো মাঝারি ও দূরপাল্লার সারফেস টু এয়ার মিসাইল সিস্টেম। এর অনুপস্থিতির কারণে দেশের আকাশসীমা পুরোপুরি উন্মুক্ত থাকবে উচ্চমাত্রার হামলার সামনে। ভারত এরই মধ্যে এস-৪০০ ট্রায়াম্প সিস্টেম মোতায়েন করেছে, যার ফলে তাদের আকাশসীমা ৪০০ কিলোমিটার পর্যন্ত সুরক্ষিত। মিয়ানমারও সংগ্রহ করেছে এসইউ৩০এসএমই এবং জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান। এমনকি ভিয়েতনামের মতো মধ্যম শক্তির দেশেও এখন ড্রোন ও মিসাইল প্রতিহত করার স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা আছে। এ বাস্তবতার সঙ্গে তাল মেলাতে পারছে না বাংলাদেশ। বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এখনো নিচু দিয়ে উড়ে যাওয়া হেলিকপ্টার ঠেকানোর স্তরে সীমাবদ্ধ।
গত ৬ জানুয়ারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে, পাকিস্তান থেকে প্রশিক্ষণ বিমান সুপার মুশশাক দ্রুত বাংলাদেশকে সরবরাহ করা হবে। এর পাশাপাশি ‘জেএফ-১৭ থান্ডার’ বিমানের সম্ভাব্য ক্রয় নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে জানানো হয়। যা দেশের জন্য সত্যিই গর্বের ও প্রশংসার দাবি রাখে। যদিও বাংলাদেশ এখন পর্যন্ত চুক্তি স্বাক্ষরের পরিবর্তে কেবল ‘আগ্রহ’ প্রকাশ করেছে। বিশ্লেষকরা বলছেন, ২০২৫ সালের ঘটনাবলি জেএফ-১৭ জেটের আবেদন বাড়িয়ে তুলেছে। তাছাড়া, জেএফ-১৭ বিমানটির দাম তুলনামূলক কম। এর দাম ২৫ থেকে ৩০ মিলিয়ন ডলার। এর ফলে গত ১০ বছরে বেশ কয়েকটি দেশ এটি কেনার আগ্রহ দেখিয়েছে। এর মধ্যেই নাইজেরিয়া, মিয়ানমার ও আজারবাইজান তাদের বহরে জেএফ-১৭ জেট যুক্ত করেছে।”জেএফ-১৭ থান্ডার হলো একটি হালকা বিমান। এটি যেকোনো আবহাওয়ায় উড়তে পারে। পাকিস্তান অ্যারোনটিক্যাল কমপ্লেক্স (পিএসি) ও চীনের চেংডু এয়ারক্রাফ্ট করপোরেশন (সিএসি) এটি যৌথভাবে নির্মাণ করে। ১৯৯০ দশকের শেষের দিকে পাকিস্তান ও চীন বিমানটি তৈরির জন্য একটি চুক্তি করে। ২০০০ সালের গোড়ার দিকে ইসলামাবাদ থেকে ৮০ কিলোমিটার দূরে পাকিস্তানের পাঞ্জাব প্রদেশে কামরারে দেশটির অ্যারোনটিক্যাল কমপ্লেক্সে (পিএসি) এটি তৈরি শুরু হয়।”
বিমান বাহিনীকে শক্তিশালী করণের লক্ষ্যে এফ সেভেন্টিন থান্ডারের পাশাপাশি চীনের তৈরি ২০টি জে-১০ সিই মাল্টিরোল যুদ্ধবিমান কেনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। প্রকল্পটির মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ২২০ কোটি মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশী মুদ্রায় প্রায় ২৭ হাজার ৬০ কোটি টাকা।সরকারি সূত্রে জানা গেছে, যুদ্ধবিমানগুলো ক্রয়, প্রশিক্ষণ, খুচরা যন্ত্রাংশ ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয়সহ পুরো প্রকল্প বাস্তবায়িত হবে ২০২৭ সালের মধ্যে। ব্যয়ের অর্থ পরিশোধ করা হবে ১০ বছরের কিস্তিতে, যা চলবে ২০৩৫-৩৬ অর্থবছর পর্যন্ত।জে-১০ সিই: চীনের ৪.৫ প্রজন্মের উন্নত যুদ্ধবিমান জে-১০ সিই হলো চীনের বিমানবাহিনীতে ব্যবহৃত জে-১০সি মডেলের রপ্তানি সংস্করণ। এটি একটি ৪.৫ প্রজন্মের মাল্টিরোল কমব্যাট এয়ারক্রাফট, যা আকাশ থেকে আকাশ ও আকাশ থেকে স্থল দুই ধরনের যুদ্ধেই সমানভাবে দক্ষ।প্রতিটি ফাইটার জেটের আনুমানিক মূল্য ৬ কোটি মার্কিন ডলার (প্রায় ৭৩০ কোটি টাকা)। ২০টি জেটের মূল মূল্য দাঁড়াবে প্রায় ১২০ কোটি ডলার (১৪,৬০০ কোটি টাকা)। প্রশিক্ষণ, যন্ত্রপাতি, পরিবহন, বিমা, অবকাঠামো উন্নয়ন, ভ্যাট ও কমিশনসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে মোট ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছে ২২০ কোটি মার্কিন ডলার।
দক্ষিণ এশিয়ার দেশ গুলিতে অতিরক্ষা বাজেটে বাংলাদেশের অবস্থান মাঝামাঝি হলেও তা সন্তোষজনক নয়। তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায় ভারত: প্রায় ৮৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বিশ্বব্যাপী সর্বোচ্চ সামরিক ব্যয়ের তালিকায় শীর্ষ ৫-এর মধ্যে অবস্থান করে।পাকিস্তান: সাম্প্রতিক অর্থবছরে প্রতিরক্ষা বাজেট ১৮% বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৩ ট্রিলিয়ন রুপি (যা প্রায় ১০.৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমতুল্য) নির্ধারণ করা হয়েছে।বাংলাদেশ: ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রতিরক্ষা খাতে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে ৪২ হাজার ২৯২ কোটি টাকা (প্রায় ৩.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)।শ্রীলঙ্কা: এদের প্রতিরক্ষা বাজেট প্রায় ৪৪২ বিলিয়ন শ্রীলঙ্কান রুপি (প্রায় ১.৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)।নেপাল: নেপালের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের জন্য বরাদ্দকৃত বাজেট প্রায় ৬৪.৯৬ বিলিয়ন রুপি (প্রায় ৪৩০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার)। উল্লেখ্য যে বিশ্ব রর্্যাংঙ্কিংয়ের ভিত্তিতে দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর প্রতিরক্ষা সক্ষমতার অবস্থানে ভারত বিশ্বে ৪র্থ,পাকিস্তান ১২তম,বাংলাদেশ ৩৫তম,শ্রীলঙ্কা ৭৯তম,নেপাল ১১৮তম ও ভুটান ১৪তম।
র্যাংঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান ৩৫ তম এটা বড় কথা নয় সবচেয়ে বড় কথা হল বাংলাদেশের চতুর্পাশে ভারতের মতো শক্তিশালী রাষ্ট্র ও মায়ানমার অবস্থিত হওয়ায় বাংলাদেশের জন্য তারা বরাবরই হুমকি । এসব শত্রু দেশের হুমকি মোকাবিলায় শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা সিস্টেমের কোন বিকল্প নেই। আকাশ প্রতিরক্ষা সিস্টেম শক্তিশালী করতে দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র , ড্রোন, ও শক্তিশালী যুদ্ধবিমান এবং অ্যাটাক হেলিকপ্টারের যথাযথ মজুর সময়ের প্রত্যাশিত দাবি। এখন যদি সচেতন না হয় তাহলে যে কোন সময় বহির্শত্রুর আক্রমণ মোকাবিলা করা বর্তমান যুদ্ধ সরঞ্জাম দিয়ে কখনো সম্ভব হবে না। সুতরাং সময় থাকতে শক্তিশালী আকাশ প্রতিরক্ষা ও যুদ্ধ সরঞ্জাম ক্রয়ের প্রতি মনোযোগী হওয়া প্রয়োজন। আশা করি জনগণের সাথে একাত্মতা পোষণ করে সরকার দ্রুত সময়ে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।
লেখক : কথাসাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক।