জীবন ও জীবিকার তাগিদে মানুষ গ্রাম থেকে শহরে, এক শহর থেকে আরেক শহরে যাচ্ছে। আবার উন্নত জীবনের আশায় অনেকে শহরে স্থায়ী হচ্ছে। কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির সংকোচন, স্থানীয় পর্যায়ে কর্মসংস্থানের অভাব, প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর এক উল্লেখযোগ্য অংশকে শহরের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। এছাড়া শিক্ষাসহ বিভিন্ন কারণে মানুষ শহরমুখী হচ্ছে। শহরে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা সহজ, সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমও বেশির ভাগ শহরকেন্দ্রিক। শহরমুখী মানুষের এই ঢল নগর জীবনের আবাসন সংকটকে দিন দিন প্রকট করে তুলেছে। অপরিকল্পিতভাবে গ্রাম থেকে শহরে মানুষের অবিরাম প্রবাহ শহরের অবকাঠামোর ওপর অনাকাক্সিক্ষত চাপ সৃষ্টি করছে । পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়নের কারণে সীমিত আয়ের ও নতুন চাকরিজীবীদের জন্য সাশ্রয়ী মূল্যের বাসস্থানের ব্যাপক ঘাটতি দেখা দিয়েছে। ফলস্বরূপ, অতিরিক্ত বাড়িভাড়া, অস্বাস্থ্যকর বস্তি বা মেস জীবন এবং দূরপাল্লার যাতায়াত সমস্যার মতো জটিলতা তৈরি হচ্ছে। উন্নত জীবন ও কর্মসংস্থানের খোঁজে ঢাকা ও এর আশেপাশের শিল্পাঞ্চলগুলোতে (যেমন-টঙ্গি, সাভার, গাজীপুর) প্রতি বছর বিপুল সংখ্যক মানুষ স্থানান্তরিত হচ্ছে, যার তুলনায় নগরের অবকাঠামো বাড়েনি। আবাসন খাতে চলমান মন্দা, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি এবং নতুন করের (যেমন: প্রস্তাবিত ১৫% ক্যাপিটাল গেইন ট্যাক্স) চাপে সাধারণ মানুষের জন্য ফ্য¬াট কেনা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। উচ্চ চাহিদা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির সুযোগ নিয়ে বাড়িওয়ালারা মাত্রাতিরিক্ত ভাড়া দাবি করেন, যা নতুন চাকরিজীবীদের বেতনের সিংহভাগই গ্রাস করে। সাশ্রয়ী আবাসনের অভাবে নিম্ন আয়ের শ্রমিক ও নতুন চাকরিজীবীরা অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, বস্তি অথবা গাদাগাদি করে মেসে থাকতে বাধ্য হন। ঢাকার প্রায় প্রতি ইঞ্চি জমি এখন অতিনিয়ন্ত্রিত উন্নয়নের দখলে। এর মধ্যে কড়াইলের মতো জনাকীর্ণ বস্তিগুলোতে প্রায় লক্ষাধিক মানুষের বসবাস। কড়াইল বস্তির নাম শুনলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে টিনের ছাউনি, সরু গলি, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ আর অনিশ্চিত জীবনের ছবি। অথচ এই বস্তির বাসিন্দারাই প্রতিদিন রাজধানীর অর্থনীতিকে সচল রাখেন। কেউ নির্মাণশ্রমিক, কেউ গৃহকর্মী, কেউ পোশাক কারখানার শ্রমিক, কেউ আবার রিকশাচালক। শহরের সবচেয়ে প্রয়োজনীয় শ্রমশক্তির একটি বড় অংশ বাস করে সবচেয়ে অনিরাপদ আবাসনে। এই বাস্তবতার মধ্যেই সরকার কড়াইলসহ গাজীপুর, রাজশাহী, বরিশাল, খুলনা, কুষ্টিয়া, ময়মনসিংহ ও নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশন এবং বিভিন্ন পৌর এলাকার ৫৮টি স্থানে প্রায় এক লাখ আবাসিক ফ্ল্যাট নির্মাণের পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।

গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে ড্যাপ (২০২২-২০৩৫)-এর অন্তর্ভুক্ত এই বিশাল কর্মযজ্ঞটি বাস্তবায়িত হলে নিম্ন আয়ের মানুষের আবাসন সংকট নিরসনে এক নতুন যুগের সূচনা হতে পারে। সরকারি ও বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে পরিচালিত এই প্রকল্পের লক্ষ্য বস্তিবাসীদের উন্নত জীবনের নিশ্চয়তা প্রদান করা। তবে এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনাটি বাস্তবায়নের পথে বিদ্যমান জটিল চ্যালেঞ্জগুলো অতিক্রম করা এবং অতীত ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তি রোধ করাই এখন সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। গৃহহীনদের জন্য ফ্ল্যাট তৈরি এক জিনিস, আর সেই ফ্ল্যাটের রক্ষণাবেক্ষণ খরচ ও কিস্তির টাকা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সামর্থ্যের মধ্যে রাখা অন্য জিনিস। অতীতে দেখা গেছে, অনেক প্রকল্পের ফ্ল্যাট বরাদ্দ দেওয়ার পর মাসের কিস্তি পরিশোধ করতে গিয়ে দরিদ্র পরিবারগুলো সর্বস্বান্ত হয়ে আবার বস্তিতে ফিরে গেছে। নির্মাণ খরচ ও নিম্ন আয়ের মানুষের আয়ের মধ্যে সামঞ্জস্য বিধান করাই হবে এই প্রকল্পের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

ঢাকার অনেক জায়গার জমির মালিকানা নিয়ে দীর্ঘদিনের আইনি লড়াই, বেদখল হওয়া সম্পত্তি ও বিরোধ রয়েছে। কড়াইল বস্তির মতো বড় এলাকাগুলোর জমির মালিকানা এবং সেখানে গড়ে ওঠা স্থানীয় শক্তিশালী সিন্ডিকেটের হাত থেকে ভূমি উদ্ধার করা দীর্ঘমেয়াদী প্রক্রিয়ার দাবি রাখে। আইনি জটিলতা নিরসন না করে প্রকল্প শুরু করা মানেই মাঝপথে তা স্থবির হয়ে যাওয়া।

পিপিপি বা পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ মডেলে বেসরকারি খাতের বিনিয়োগকারীদের প্রধান উদ্দেশ্য থাকে মুনাফা। যদি সরকার তাদের ওপর বিনিয়োগের সঠিক নিয়ন্ত্রণ রাখতে না পারে, তবে তারা প্রকল্পের বড় অংশ বাণিজ্যিক ভিত্তিতে ব্যবহার করার চেষ্টা করবে। ফলে দরিদ্র মানুষের ফ্ল্যাট কমে আসবে এবং প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্যই বিচ্যুত হবে।

১ লক্ষ ফ্ল্যাটের অর্থ হলো অন্তত ৫ থেকে ৭ লক্ষ মানুষের বসতি। ঢাকার বিদ্যমান পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ এবং পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা আগে থেকেই চরম চাপের মুখে। নতুন করে এই বিশাল জনসংখ্যার জন্য নাগরিক সেবা নিরবচ্ছিন্নভাবে নিশ্চিত করা বিশাল এক ইঞ্জিনিয়ারিং ও প্রশাসনিক চ্যালেঞ্জ।

যেকোনো প্রকল্পের ভবিষ্যৎ বোঝার জন্য তার অতীত ইতিহাস জানা জরুরি। ‘ভাষানটেক পুনর্বাসন প্রকল্প’ এবং ‘আশ্রয়ণ প্রকল্প’-এই দুটি প্রকল্পের ব্যর্থতা ও সীমাবদ্ধতা আমাদের জন্য বড় শিক্ষা।

মিরপুরের ভাষানটেক পুনর্বাসন প্রকল্পটি বাংলাদেশের আবাসন খাতে পিপিপি মডেলের একটি বড় ব্যর্থ উদাহরণ। এর ব্যর্থতার মূল কারণগুলো ছিল:

ডেভেলপারের অতিরিক্ত মুনাফালোভ : দায়িত্বপ্রাপ্ত ডেভেলপার প্রতিষ্ঠান এনএসপিডিএল (NSPDL) চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে বস্তিবাসীদের জন্য নির্ধারিত ফ্ল্যাটগুলো উচ্চবিত্তদের কাছে চড়া দামে বিক্রি করে দিয়ে মুনাফা অর্জন করতে চেয়েছিল।

অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি : প্রকল্পের শুরুতে ফ্ল্যাটের দাম নিম্ন আয়ের মানুষের সামর্থ্যের মধ্যে (১.৯০ লক্ষ টাকা) থাকলেও, পরবর্তীতে তা ৫ লক্ষ টাকায় উন্নীত করা হয়। এই বর্ধিত দামের কিস্তি পরিশোধ করা বস্তিবাসীদের জন্য অসম্ভব হয়ে পড়ে।

রাজনৈতিক ও মধ্যস্বত্বভোগীদের হস্তক্ষেপ : প্রকৃত বস্তিবাসীদের পরিবর্তে রাজনৈতিক নেতা এবং স্থানীয় প্রভাবশালীরা এই ফ্ল্যাটগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয়। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তদন্তেও বেরিয়ে এসেছিল যে, প্রকল্পের অধিকাংশ সুবিধাভোগীই প্রকৃত বস্তিবাসী ছিলেন না।

দীর্ঘসূত্রতা ও অসম্পূর্ণতা : প্রকল্পের ধীরগতিতে কাজের কারণে কয়েক দশক পার হওয়ার পরও অনেক ফ্ল্যাট অসম্পূর্ণ থেকে যায়, যা পুরো পরিকল্পনাটিকে অকার্যকর করে তোলে।

আশ্রয়ণ প্রকল্প যদিও ভূমিহীনদের ঘর দেওয়ার ক্ষেত্রে অনন্য একটি উদ্যোগ, তবুও এর বাস্তবায়নে ভয়াবহ দুর্নীতি ও অদূরদর্শিতার ছাপ রয়েছে :

নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী : অনেক ক্ষেত্রে ইউএনও (UNO)ও স্থানীয় প্রশাসন কর্তৃক তদারকির অভাবে নির্মাণসামগ্রী অত্যন্ত নিম্নমানের ছিল। ফলে ঘর হস্তান্তরের অল্প সময়ের মধ্যেই ফাটল ধরা বা ভেঙে পড়ার ঘটনা ঘটেছে।

ভৌগোলিক ও অবস্থানগত ভুল : অনেক ঘর এমন নিচু ভূমি বা চরাঞ্চলে নির্মাণ করা হয়েছিল যা পরবর্তীতে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এটি চরম অপরিকল্পিত উন্নয়নের একটি দৃষ্টান্ত।

জীবিকার অভাব ও সামাজিক বিচ্যুতি : মানুষকে ঘর দিলেই পুনর্বাসন হয় না। অনেক ক্ষেত্রে ঘরগুলো কর্মসংস্থান থেকে অনেক দূরে ছিল। ফলে দরিদ্র মানুষ তাদের উপার্জনের নেটওয়ার্ক হারিয়ে সেই জায়গা ছেড়ে আবারও শহরের বস্তিতে ফিরে এসেছে। তাই, প্রশ্ন হলো, সরকার কি সত্যিই বস্তির মানুষের আবাসন সমস্যার সমাধান করবে, নাকি অতীতের ভাষানটেক পুনর্বাসন প্রকল্পের মতো আরেকটি অপূর্ণ স্বপ্ন হয়ে থাকবে?

বাংলাদেশে উন্নয়ন প্রকল্পের সবচেয়ে বড় সংকট অর্থের অভাব নয়, বরং বাস্তবায়নের দুর্বলতা। বহু ভালো পরিকল্পনা মাঠপর্যায়ে গিয়ে রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্নীতি, দুর্বল তদারকি কিংবা ভুল নীতিগত সিদ্ধান্তের কারণে কাক্সিক্ষত ফল দেয়নি। ফলে কড়াইল প্রকল্পকে মূল্যায়নের সময় কেবল এর আকার নয়, এর বাস্তবায়ন কাঠামোকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি অর্থনৈতিক। নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ফ্ল্যাট নির্মাণ করা তুলনামূলক সহজ, কিন্তু সেই পরিবারগুলোর পক্ষে মাসিক কিস্তি, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়, বিদ্যুৎ, পানি ও অন্যান্য সেবা বাবদ খরচ বহন করা সম্ভব হবে কি? ভাষানটেক প্রকল্পের অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে, ফ্ল্যাটের দাম এবং মানুষের প্রকৃত আয় যদি একই সমীকরণে না আসে, তবে মানুষ শেষ পর্যন্ত আবারও বস্তিতেই ফিরে যায়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পুনর্বাসনের দর্শন। পুনর্বাসন মানে কেবল মানুষকে নতুন ঠিকানা দেওয়া নয়। তাদের কর্মসংস্থান, সামাজিক সম্পর্ক, সন্তানের বিদ্যালয়, চিকিৎসাসেবা এবং দৈনন্দিন জীবনযাত্রার ধারাবাহিকতাও নিশ্চিত করতে হয়। এসব বিবেচনায় না আনলে বহুতল ভবন দাঁড়িয়ে থাকবে, কিন্তু মানুষ সেখানে টিকে থাকবে না।

পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ বা পিপিপি মডেলও একদিকে সম্ভাবনা, অন্যদিকে ঝুঁকি। বেসরকারি বিনিয়োগ স্বাভাবিকভাবেই মুনাফা খোঁজে। তাই সরকারের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব হবে এমন নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তোলা, যাতে প্রকল্পের সামাজিক উদ্দেশ্য কোনোভাবেই বাণিজ্যিক স্বার্থের কাছে পরাজিত না হয়। অন্যথায় নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য নির্ধারিত ফ্ল্যাট ধীরে ধীরে উচ্চ আয়ের বাজারে চলে যাওয়ার আশঙ্কা থেকেই যাবে।

এখানেই আসে রাষ্ট্রের জবাবদিহিতার প্রশ্ন। প্রকৃত সুবিধাভোগী নির্বাচন, ডিজিটাল নিবন্ধন, স্বচ্ছ লটারি ব্যবস্থা, স্বাধীন তদারকি এবং নিয়মিত অডিট ছাড়া এত বড় প্রকল্পে জনআস্থা তৈরি করা সম্ভব নয়। অতীতের ভুলগুলোকে উপেক্ষা করলে ভবিষ্যতের ব্যর্থতাও অবধারিত।

এই প্রকল্পের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক হলো এটি সফল হলে শুধু বস্তির সংখ্যা কমবে না, বরং নগর অর্থনীতি আরও উৎপাদনশীল হবে। সুস্থ আবাসন মানে সুস্থ শ্রমশক্তি, উন্নত শিক্ষার পরিবেশ, কম অপরাধ, উন্নত জনস্বাস্থ্য এবং দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্রের সামাজিক ব্যয়ও কমে আসা। অর্থাৎ এটি কেবল একটি নির্মাণ প্রকল্প নয়, বরং মানবসম্পদে বিনিয়োগ।

তবে এজন্য একটি মৌলিক পরিবর্তন জরুরি। আবাসনকে ব্যবসা হিসেবে নয়, জনসেবা হিসেবে দেখতে হবে। সরকার, বেসরকারি খাত, স্থানীয় সরকার, নগর পরিকল্পনাবিদ এবং পুনর্বাসিত জনগোষ্ঠীকে একই টেবিলে বসিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।

কড়াইলসহ ৫৮টি স্থানে এক লাখ ফ্ল্যাট নির্মাণের পরিকল্পনা বাংলাদেশের নগর ইতিহাসে নতুন অধ্যায়ের সূচনা করতে পারে। আবার এটি অতীতের ব্যর্থতার পুনরাবৃত্তিও হতে পারে। দুই সম্ভাবনার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে একটি মাত্র বিষয়, আর সেটি হলো সুশাসন। ভবন নির্মাণই উন্নয়ন নয়; মানুষের জীবনমানের ইতিবাচক স্থায়ী পরিবর্তনই প্রকৃত উন্নয়ন। সেই পরিবর্তন নিশ্চিত করতে পারলেই এই প্রকল্প হবে একটি সফল আবাসন উদ্যোগই নয়, বরং অন্তর্ভুক্তিমূলক নগর বাংলাদেশের নতুন মাইলফলক।