মুহাম্মদ নিজাম উদ্দিন

বাংলা কবিতার আধুনিক যুগে কবি ফররুখ আহমদ প্রাতিস্বিক এক স্বর। তাঁকে প্রায়শই ‘ইসলামি রেনেসাঁর কবি’ বলে চিহ্নিত করা হলেও এই পরিচয় তাঁর সৃজনশীল মানসের পূর্ণতা বোঝাতে যথেষ্ট নয়। তাঁর কবিতায় ইসলামি ভাবধারা যেমন আছে, তেমনি আছে ন্যায়, মানবতা, সামাজিক জাগরণ ও নৈতিক পুনর্গঠনের আহ্বান। ফররুখ আহমদ বাংলা কাব্যরীতিকে নতুন মর্যাদায় উন্নীত করেছেন। তাঁর কাব্যের মূলে রয়েছে ধর্মবোধ। এ ধর্মবোধই মানবমুক্তির ভাষা। ফররুখ-কাব্যের এই মানবমুক্তির ভাষাই তাঁর অনালোচিত মানবতাবাদ। ধর্মীয় নৈতিকতা- সামাজিক ন্যায়বোধ ও আধুনিকতার সমন্বয়ে গঠিত। বর্তমান সময়ে যখন ধর্ম ও মানবতার সম্পর্ককে বিরোধী হিসেবে দেখা হয়, তখন ফররুখ আহমদের কাব্যচেতনা আমাদের সামনে ‘আল্লাহ্মুখী মানবতাবাদ’-এর নতুন পথ খুলে দেয়।

ফররুখ আহমদের কবিতায় মানুষই মুখ্য বিষয়, কিন্তু সেই মানুষ কোনো ভোগবাদী বা বস্তুনির্ভর সত্তা নয়; বরং সে সত্তা আত্মিক জাগরণের অনুসন্ধানী। এই বোধই তাঁর মানবতাবাদের ভিত্তি। ইসলাম তাঁর কাছে কেবল আচারবিধি নয়; বরং নৈতিকতা ও ন্যায়চেতনার নাম। কারণ সত্যিকারের মানুষ হতে হলে আল্লাহ্-বিশ্বাসই হতে পারে মানবিক চেতনার মূল শক্তি। এ কারণেই ফররুখের মানবতাবাদ ধর্মবিরোধী নয়; বরং ধর্মের আধ্যাত্মিক আলোয় মানুষকে মুক্তির পথ দেখায়। সংকীর্ণ কোনো ধার্মিকতা ফররুখের ইসলামি চেতনা নয়; বরং সর্বজনীন নৈতিক কাঠামোই হলো ইসলামি চেতনা। এই বিশ্লেষণ থেকেই স্পষ্ট: ফররুখের মানবতাবাদ আসলে নৈতিক এক মানবতাবাদÑ যেখানে মানুষের মুক্তি নিহিত ন্যায়, প্রেম ও আল্লাহ্-নিষ্ঠতার গভীরে।

কবি ব্রিটিশ-পরবর্তী ঔপনিবেশিক সমাজে বসবাস করলেও তাঁর কাব্যদৃষ্টি ছিল প্রতিরোধনির্ভর। ‘সাত সাগরের মাঝি’, ‘পাঞ্জেরি’, ‘তুফান’ প্রভৃতি কবিতায় তিনি শুধু ধর্মীয় বিশ্বাসের পুনর্জাগরণ করেননি; বরং বিদেশি শাসন ও সংস্কৃতিগত দাসত্বের বিরুদ্ধেও ‘আধ্যাত্মিক এক জাতীয়তাবাদ’ প্রতিষ্ঠা করেছেন। তাঁর ‘সাত সাগরের মাঝি’ (১৯৪৪) কাব্যের ‘মাঝি’ প্রতীক হয়ে ওঠে মুক্ত এক মানুষের, যিনি স্রোতের বিপরীতে দাঁড়িয়ে নিজের আত্মপরিচয় খুঁজে পান। তাছাড়া তাঁর ‘সিরাজাম মুনীরা (১৯৫২)’, ‘নৌফেল ও হাতেম (১৯৬১)’, ‘মুহূর্তের কবিতা (সনেট) [১৯৬৩]’, ‘হাতেম তায়ী (মহাকাব্য) [১৯৬৬]’ প্রভৃতি গ্রন্থে ফুটে ওঠা প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মানবিক আবেদন বেশ তাৎপর্যপূর্ণ।

ফররুখ আহমদ বরাবরই রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে ছিলেন। বাংলা ভাষার পক্ষে প্রবন্ধ লিখেছেন “পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা ও সাহিত্য” শিরোনামে। তিনি স্পষ্টতই জানিয়ে দিয়েছেন, “আমি আগেই বলেছিলাম যে, বাংলা ভাষার পরিবর্তে অন্য ভাষাকে পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করলে এই দেশে ইসলামী সংস্কৃতিকে হত্যা করা হবে।” বাংলা ভাষার জন্য তিনি প্রতিবাদে অংশগ্রহণও করেছিলেন। এ প্রেক্ষিতে তিনি একজন ভাষা-সৈনিকও।

সমালোচকগণ বলেন: ফররুখের কবিতার ধর্মীয় সত্তা আসলে মুক্তিকামী একটি রাজনৈতিক চেতনা; যা ঔপনিবেশিক শোষণের বিরুদ্ধে আত্মপরিচয়ের ভাষা নির্মাণ করেছে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা যায়: ফররুখের মানবতাবাদ কোনো নিষ্ক্রিয় ভক্তিবাদ নয়; বরং সক্রিয় সামাজিক ও রাজনৈতিক সচেতনতার প্রকাশ। তাই মানবিক কবি ফররুখ আহমদ ডাক দিয়ে বলেন:

“আজকে তোমার পাল ওঠাতেই হবে,

ছেঁড়া পালে আজ জুড়তেই হবে তালি,

ভাঙা মাস্তুল দেখে দিক করতালি,

তবু জাহাজ আজ ছোটাতেই হবে।” (সাত সাগরের মাঝি)

তিনি নিসর্গের সৌন্দর্যে আল্লাহ্র অস্তিত্ব ও মানবতার ঐক্য অনুভব করেন। আধ্যাত্মিক এই পরিবেশচেতনা ফররুখকে আধুনিক চিন্তার সঙ্গে যুক্ত করে। আজকের জলবায়ু সংকট, নৈতিক অবক্ষয় ও ভোগবাদী মানবসভ্যতার প্রেক্ষাপটে তাঁর এই ‘আল্লাহ্-কেন্দ্রিক পরিবেশ-মানবতাবাদ’ নতুন এক ব্যাখ্যা দাবি করে।

বাংলা কাব্যের জন্য অত্যুচ্চ এক ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখেছেন কবি ফররুখ আহমদ। এই স্বপ্ন-অনুসন্ধান ধর্মীয় নয়; বরং অস্তিত্বমুখী। যেখানে বিশ্বাস, ন্যায় এবং স্বাধীনতা একাকার হয়ে যায়। কবির বিশ্বাস: শাশ্বত জীবন-প্রণালী ইসলামই হচ্ছে সর্বযুগে সর্বদেশে মানবিক আদর্শ ও জীবন-সমস্যার সহায়ক শক্তি। তাঁর লেখনীর মধ্য দিয়ে তিনি ইসলামি আদর্শের স্বরূপের সাধনা করেছেন। কবি মুসলমানের মুক্তির জন্য আল্লাহ্র প্রতি অবিচল বিশ্বাস ও কার্যকর ভূমিকা পালনের প্রতি অবিচল বিশ্বাসের কথা সকলকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। ফররুখের মতাদর্শের জমিনে আধুনিক শিল্পচেতনার স্পর্শে তিনি উত্তম কাব্য সৃজন করেছেন। কবি বলেন:

“জাগো বন্দরে কৈফিয়তের তীব্র ভ্রুকুটি হেরি,

জাগো অগণন ক্ষুধিত মুখের নীরব ভ্রুকুটি হেরি!

দেখ চেয়ে দেখ, সূর্য ওঠার কত দেরি, কত দেরি!

পাঞ্জেরি।” (পাঞ্জেরি, সাত সাগরের মাঝি)

মানবতার কল্যাণের জন্য মাঝিকে জেগে ওঠার আহ্বানের মধ্য দিয়ে তিনি মানবতার গান গেয়েছেন তাঁর সমস্ত সৃষ্টিসম্ভারে।

ফররুখ আহমদের কাব্যে নিসর্গ মহিমান্বিত একটি সত্তাÑ যা মানুষ ও সৃষ্টিকর্তার মধ্যবর্তী প্রতীকী এক সেতুবন্ধন। ‘নৌফেল ও হাতেম’-কাব্যনাট্যে প্রকৃতি শুধু রূপ-আলো নয়; বরং সৃষ্টির অন্তর্নিহিত ঐশ্বর্যের প্রকাশ। কবির এ-অভিব্যক্তি ফুটে উঠেছে তাঁর সমগ্র কাব্যনাট্যে।

ফররুখ আহমদ ইসলামি রেনেসাঁর কবি হওয়া সত্ত্বেও তিনি মানবতাবাদী একজন কবি। কেউ কেউ তাঁকে নির্যাতিত মানবতার তূর্যবাদক বলেও আখ্যায়িত করেছেন। যে নিরিখে কাজী নজরুল ইসলামকে একই সাথে বিদ্রোহের কবি, প্রেমের কবি এবং মুসলিমের নবজাগরণের কবি বলে আখ্যায়িত করা হয়; সেই একই নিরিখে ফররুখ আহমদও একাধিক অভিধায় অভিহিত হওয়ার দাবিদার।

তিনি ছিলেন সত্যিকার অর্থে মহৎ এক কবি-প্রাণের অধিকারী ব্যক্তিত্ব। আর সে সঙ্গে ছিল তাঁর এক আপসহীন জীবনসত্তা; যা তাঁর আদর্শকে আজীবন সমুন্নত রেখেছিল। আদর্শের জন্য তিনি কখনো আপস করতে জানতেন না। ধর্মীয় চেতনা ও রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গেও কখনো আপস করেন নি। এমন শুদ্ধাচার আদর্শবান কবি কেবল বর্তমান সমাজেই নয়; সব সমাজেই দুর্লভ। এ সত্যাশ্রয়ী কবি দারিদ্র্যের সঙ্গে সংগ্রাম করে নিঃশেষ হয়ে গেলেন; কিন্তু সত্য, ন্যায় ও মনুষ্যত্ববোধ থেকে ভ্রষ্ট হননি।

মানবতার কবি বরাবরই স্বপ্ন দেখেছেন শোষণমুক্ত ও বিভেদহীন একটি সমাজব্যবস্থার। তাঁর লালিত এই স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করলেন:

“সে বিপুল প্রাণ-ব‎িহ্ন তবু আজো মনে নাই জানি,

হে বলিষ্ঠ! যদি তুমি নেমে এসো এ পথে বারেক

এই মৃত মরুতটে যদি তুমি দাঁড়াও সন্ধানী

মানুষের এ মিছিলে দিতে পারো যদি গতিবেগ,

অনায়াসে সে ঝড় আবার তুলিবে তারা টানি

মৃত মাঠ দিয়ে যাবে সাহারার উদ্দাম আবেগ।” (তুফান, সাত সাগরের মাঝি)

তাঁর রচনাসম্ভার অনেক ঋদ্ধ। গীতি কবিতা, মহাকাব্য, সনেট, প্রবন্ধ, নাটক, সংগীত, বেতার কথিকা, গীতি নকশা প্রভৃতি রচনায় তিনি নৈপূণ্য দেখিয়েছেন। সম্ভবত বাংলা ভাষায় সনেট রচনার ক্ষেত্রে মাইকেলের পর তাঁর স্থান নির্ধারিত হবে। তাঁর প্রকাশিত কাব্যগন্থের সংখ্যা ১৫টি। যথা: ১. সাত সাগরের মাঝি (১৯৪৪), ২. আজাদ কর পাকিস্তান (১৯৪৬), ৩. সিরাজাম মুনীরা (১৯৫২), ৪. নৌফেল ও হাতেম (১৯৬১), ৫. মুহূর্তের কবিতা (১৯৬৩), ৬. হাতেম তায়ী (১৯৬৬), ৭. হে বন্য স্বপ্নেরা (১৯৭৬), ৮. ইকবালের নির্বাচিত কবিতা (১৯৮০), ৯. কাফেলা (১৯৮০), ১০. হাবেদা মরুর কাহিনী (১৯৮১), ১১. তসবিরনামা (১৯৮৬), ১২. দিলরুবা (১৯৯৪), ১৪. অনুস্বার (ব্যঙ্গ সনেট) এবং ১৫. ধোলাই কাব্য (ব্যঙ্গ সনেট) ইত্যাদি। এর মধ্যে সাত সাগরের মাঝি, সিরাজাম মুনীরা, নৌফেল ও হাতেম, হে বন্য স্বপ্নেররা, ইকবালের নির্বাচিত কবিতা, কাফেলা, দিলরূবা, অনুস্বার প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য। অসংখ্য হামদ, নাত, দেশাত্মবোধক সংগীত, প্রেম ও ভক্তিমূলক গান এবং আধুনিক বাংলা সংগীত রচনা করে তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন। এ ছাড়া তিনি গল্পও লিখেছেন। এর মধ্যে ‘প্রচ্ছন্ন নায়িকা’, ‘মৃত বসুধা’, ‘বিবর্ণ’ প্রভৃতি বিখ্যাত গল্প। ‘সিকান্দার শার ঘোড়া’ নামে একটি উপন্যাস লেখার চেষ্টা করলেও মৃত্যুর কারণে তা আর শেষ করতে পারেননি।

ফররুখের মানবতাবাদ কেবল ভাবগত নয়, ভাষাগতও। তাঁর ছন্দ, ধ্বনি, অনুপ্রাস ও আরবি-ফারসি শব্দবিন্যাসে যে গাম্ভীর্য ও ঐশ্বর্য, তা তাঁর কবিতাকে মহাকাব্যিক উচ্চতায় নিয়ে গেছে। কবির কাব্যভাষা ধর্মীয় বিশ্বাস-কেন্দ্রিক হলেও তার মূলে রয়েছে আধুনিক কাব্যিক উষ্ণ প্র¯্রবণ। এই উষ্ণতাই তাঁর মানবপ্রেমের প্রকাশভঙ্গিÑ যেখানে প্রতিটি শব্দ আল্লাহ্নিষ্ঠ অথচ মানবমুখী।

তাঁর কবিতায় ভাষার বৈচিত্র্য রয়েছে। তিনি সংগ্রামী চেতনা বিষয়ে কবিতা নির্মাণে চরিত্রের উপযোগী শব্দাবলি ব্যবহার করেছেন। প্রেমের কবিতা সৃষ্টিতে শব্দাবলী ব্যবহারে তিনি রোমান্টিক ভাবাবেগের পরিচয় উপস্থিত করেছেন। আবার জাতীয় উদ্দীপনামূলক কবিতায় উচ্ছলতাকে প্রাধান্য দিয়েছেন। সবকিছু মিলে তাঁর কবিতা পাঠকের মনে এমন একটি সুকুমার মোহন সত্তার সৃষ্টি করে; যা বাংলা কাব্যে কবির বুদ্ধি ও বিবেচনার ফল।

কাব্য-রীতিতে তাঁর কৃতিত্ব আছে। তিনি নিঃসন্দেহে আধুনিক কবি; বাংলা কবিতায় আধুনিকতা উন্মোচনের ক্ষেত্রে তাঁর প্রত্যক্ষ ভূমিকা রয়েছে। কবি ফররুখ আহমদ বাংলা কবিতাÑ নির্মাণে এবং কাব্যে তাঁর অধিকার প্রতিষ্ঠার প্রচ-তায় নিঃশব্দ এবং দুর্দমনীয় ছিলেন। তাঁর এ শিল্প-স্বভাব চিরদিন এদেশবাসীর প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

কবি শিশুদের জন্য যে-রচনাসম্ভার রেখে গেছেন, তার প্রতি ছত্রেই আদর্শের কথা সুস্পষ্টভাবে অনুরণিত হয়েছে। তিনিই সার্থক কবি যিনি তারুণ্যের উচ্ছলতাকে উপেক্ষা না করেও তাদের জন্য রেখে গেছেন নীতিকথার এক অপূর্ব সমাহার। তিনি জাতির ভবিষ্যৎ বংশধরদেরÑ যারা আগামী দিনে প্রতিষ্ঠা লাভ করে সমাজের কর্ণধার হিসেবে লব্ধ প্রতিষ্ঠিত হবেÑ তাদের মনে সহনশীলতা, স্বাবলম্বিতা, সত্যবাদিতা প্রভৃতি সৎ গুণাবলির বিকাশ সাধন, সর্বোপরি আদর্শ চরিত্রবান ও দুর্জয় সাহসী হিসেবে গড়ার জন্য সার্থক চেষ্টা চালিয়েছেন।

তিনি বাংলা সাহিত্যাকাশে এক জ্বলজ্বলে নক্ষত্র; ধ্রুবতারার ন্যায় তিনি উজ্জ্বল, সত্য এবং একান্তই নিঃসঙ্গ। কবি নজরুল ইসলামের যথার্থ উত্তরসূরি হয়েও তিনি অনন্য। তিনি আকাক্সক্ষায় আশাবাদী, বিশ্বাসে অকৃত্রিম এবং সিদ্ধান্তে অনড়। যে গুণাবলি একজন মানুষকে কালের পটে চিরন্তন করে, মহৎ করে এবং তাঁর ব্যক্তিত্বকে আদর্শ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেÑ তার সবগুলোরই অনন্য উজ্জ্বল উপস্থিতি ছিলো ফররুখ আহমদের চরিত্রে। আর তাই ফররুখ আহমদ সাধারণ সামাজিক একজন মানুষ হয়েও তিনি হয়ে উঠেছেন একটি আদর্শ, একটি প্রতিষ্ঠান।

কবি ফররুখের ১৩৫০ বঙ্গাব্দের (১৯৪৩ খ্রি.) মন্বন্তরের মর্মান্তিক চিত্রসম্বলিত মানবিক আকাক্সক্ষার শ্রেষ্ঠ একটি নিদর্শন তাঁর ‘লাশ’ কবিতা। এখানে বিশ্ববাসী তথাকথিত ‘সভ্যজাতি’র অন্বিষ্ট মানবতার অন্তঃসারশূন্যতার ব্যাদান একটি মুখ প্রত্যক্ষ করে। কবি বলেন:

“হে জড় সভ্যতা!

মৃত-সভ্যতার দাস স্ফীতমেদ শোষক সমাজ

মানুষের অভিশাপ নিয়ে যাও আজ।

তারপর আসিলে সময় বিশ্বময়

তোমার শৃঙ্খলগত মাংসপি-ে পদাঘাত হানি

নিয়ে যাবে জাহান্নামের দারপ্রান্তে টানি;

আজ ঐ উৎপীড়িতের মৃত্যু-দীর্ণ নিখিলের অভিশাপ বও;

ধ্বংস হও, তুমি ধ্বংস হও।” (লাশ, সাত সাগরের মাঝি)

ফররুখ আহমদের কাব্য একদিকে আল্লাহ্মুখী বিশ্বাসের, অন্যদিকে মানবমুক্তির কাব্য। তাঁর অনালোচিত মানবতাবাদ আমাদের শেখায়: সত্যিকার মানবতা ধর্মকে অস্বীকার নয়; বরং তার আধ্যাত্মিক আলোয় উদ্ভাসিত হয়ে মানবতা প্রতিষ্ঠিত হয়। তিনি দেখিয়েছেনÑ মানুষ যখন আল্লাহ্-বিশ্বাস হারায়, তখন নৈতিক ও সামাজিক অবক্ষয় অনিবার্য হয়ে ওঠে। আজকের বিশ্বেÑ যেখানে মানুষ প্রযুক্তির দাসত্বে, ধর্মের নামে বিভক্ত ও নৈতিকতার সংকটে জর্জরিতÑ সেখানে ফররুখ আহমদের কবিতা এক আলোকবর্তিকা। তাঁর কাব্যের মানবতাবাদ আমাদের আহ্বান জানায়: ‘শুধু ধর্মে নয়, মানবপ্রেমে খুঁজে নাও আল্লাহ্কে’। অতএব, ফররুখ আহমদের মানবতাবাদ অতীতমুখী কোনো ভাবনা নয়; এটি বর্তমানের জন্য নৈতিক পুনর্জাগরণের এক দর্শন। তাঁর কাব্য আমাদের মনে করিয়ে দেয়: মানুষ কেবল মাটির নয়; সে আলোর সন্তান; আর সেই আলোই মানবতার প্রকৃত দিশা।