আবু সাইদ বিশ্বাস, সাতক্ষীরা : ডিজিটাল যুগে নানা বেসরকারি কুরিয়ার প্রতিষ্ঠানের প্রতিযোগিতার মধ্যেও কম খরচে নির্ভরযোগ্য সেবা দিয়ে সাধারণ মানুষের আস্থা ধরে রেখেছে ডাক বিভাগ। বিশেষ করে চলতি আম মৌসুমে সাতক্ষীরা পোস্ট অফিসের পার্সেল সেবায় ব্যাপক সাড়া মিলেছে। কম খরচে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে আম পাঠানোর সুযোগ থাকায় গ্রাহকদের আগ্রহও বেড়েছে। ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয়ে ডাক বিভাগ এখন শুধু চিঠি আদান-প্রদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই; বরং সাশ্রয়ী ও বহুমুখী সেবার মাধ্যমে সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে সাতক্ষীরায় আমের মৌসুমে ডাক বিভাগের এই সাফল্য তারই বাস্তব প্রমাণ। সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, ডাক বিভাগের অবকাঠামো ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা আরও উন্নত করা গেলে গ্রামীণ অর্থনীতি ও ডিজিটাল সেবা সম্প্রসারণে প্রতিষ্ঠানটি আরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারবে। ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় আধুনিক সেবার সমন্বয়ে দেশের গ্রামীণ পোস্ট অফিসগুলো এখন সত্যিকার অর্থেই জনগণের নিকটবর্তী সেবাকেন্দ্রে পরিণত হচ্ছে।

ঐতিহাসিক সূত্রে জানা যায়, ব্রিটিশ শাসনামলে আধুনিক ডাকব্যবস্থা চালুর ধারাবাহিকতায় সাতক্ষীরা অঞ্চলে ডাক বিভাগের কার্যক্রম শুরু হয়। পরবর্তীতে মহকুমা ও জেলা প্রশাসনের সম্প্রসারণের সঙ্গে সঙ্গে ডাক বিভাগের নেটওয়ার্কও বিস্তৃত হয়। বর্তমানে জেলার সাতটি উপজেলায় প্রধান, উপ-ডাকঘর ও শাখা ডাকঘর মিলিয়ে বিস্তৃত একটি সেবাব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, যা শহর থেকে গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে সরকারি সেবা পৌঁছে দিচ্ছে।

বর্তমানে জেলায় ১টি প্রধান ডাকঘর, ৯টি উপ-ডাকঘর (সাব-পোস্ট অফিস) এবং প্রায় ১৪০টির বেশি শাখা ডাকঘর (ব্রাঞ্চ পোস্ট অফিস) রয়েছে। জেলার সাতটি উপজেলার শহর ও গ্রামাঞ্চলে বিস্তৃত এ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে ডাক বিভাগ পার্সেল পরিবহন, ডাক সঞ্চয় ব্যাংক, অর্থ লেনদেন, ই-কমার্স সেবা, ডাক জীবন বীমা ও বিভিন্ন সরকারি সেবা প্রদান করছে। বিশেষ করে ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ের শাখা ডাকঘরগুলো স্থানীয় জনগণের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সেবাকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে, যেখানে প্রতিদিন শত শত মানুষ বিভিন্ন সেবা গ্রহণ করছেন।

সাতক্ষীরা পোস্ট অফিসের পোস্টমাস্টার দেবাশিষ কুমার জানান, ডাক বিভাগের পার্সেল সেবা অন্যান্য অনেক মাধ্যমের তুলনায় সাশ্রয়ী। ডাক বিভাগের মাধ্যমে ১০ কেজি আম পাঠাতে খরচ হয় মাত্র ৭০ টাকা। অথচ একই পরিমাণ আম বেসরকারি পরিবহন বা কুরিয়ার সেবায় পাঠাতে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়। তিনি আরো জানান, চলতি মৌসুমে শুধুমাত্র আম পরিবহন থেকেই প্রায় ৩ লাখ টাকা রাজস্ব আয় হয়েছে। জেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে প্রতিদিন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ আম ডাক বিভাগের মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানো হচ্ছে।

সাতক্ষীরা ডাক বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ১০০ গ্রাম ওজনের যেকোনো পার্সেল পাঠাতে খরচ হয় মাত্র ১০ টাকা। ১ কেজি পর্যন্ত পার্সেল পাঠানোর জন্য নির্ধারিত খরচ ২৯ টাকা। ফলে স্বল্প খরচে নিরাপদে পণ্য পাঠাতে সাধারণ মানুষ ডাক বিভাগের সেবার দিকে ঝুঁকছেন। শুধু পার্সেল পরিবহনই নয়, ডাক বিভাগ বর্তমানে বহুমুখী সেবা প্রদান করছে। এর মধ্যে রয়েছে চিঠি ও নথিপত্র প্রেরণ, ই-কমার্স পণ্য সরবরাহ, ডাক সঞ্চয় ব্যাংক সেবা, পোস্টাল ক্যাশ কার্ড, ইলেকট্রনিক মানি ট্রান্সফার সার্ভিস (ইএমটিএস), ডাক জীবন বীমা, বিভিন্ন সরকারি ফি ও বিল গ্রহণ, আবেদনপত্র ও পরীক্ষার ফরম প্রেরণসহ নানা ধরনের জনসেবা।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, অনলাইন ব্যবসা সম্প্রসারণের ফলে পার্সেল পরিবহনের চাহিদা বেড়েছে। কম খরচ ও বিস্তৃত নেটওয়ার্কের কারণে ডাক বিভাগের সেবা ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য বিশেষভাবে সহায়ক ভূমিকা পালন করছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে বিস্তৃত ডাক বিভাগের অবকাঠামোকে আরও আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর করা গেলে সেবার পরিধি আরও বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে কৃষিপণ্য ও স্থানীয় উৎপাদিত পণ্য পরিবহনে ডাক বিভাগ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারবে। গ্রামীণ ডাকঘরগুলোতে এখন অনেক মানুষ সঞ্চয় হিসাব পরিচালনা, অর্থ লেনদেন, সরকারি ভাতা সংক্রান্ত তথ্য গ্রহণ এবং বিভিন্ন প্রশাসনিক কাজে সহায়তা পাচ্ছেন। ফলে এসব ডাকঘর কার্যত গ্রামীণ জনগণের জন্য একেকটি ক্ষুদ্র সেবাকেন্দ্রে রূপ নিয়েছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের মতে, ইউনিয়ন ও গ্রাম পর্যায়ে ডাক বিভাগের উপস্থিতি সাধারণ মানুষের সময় ও অর্থ দুটিই সাশ্রয় করছে। বিশেষ করে বয়স্ক ব্যক্তি, কৃষক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী এবং শিক্ষার্থীরা ডাকঘরের বিভিন্ন সেবা থেকে সরাসরি উপকৃত হচ্ছেন।

ঐতিহ্য ও আধুনিকতার সমন্বয়ে ডাক বিভাগ এখন আর শুধু চিঠি আদান-প্রদানের প্রতিষ্ঠান নয়; বরং গ্রামীণ জনজীবনের নির্ভরযোগ্য সেবাসঙ্গী হিসেবে নতুন পরিচয়ে এগিয়ে চলেছে।