বিশ্ব ফুটবলে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী দুই দল ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনা। তাই প্রত্যাশিতভাবেই লাতিন আমেরিকার এই দুই পরাশক্তির মাঠের লড়াই নিয়ে ভক্ত-সমর্থকদের মাঝে উদ্দীপনার শেষ নেই। ‘সুপার ক্লাসিকো’ নামে পরিচিত এ দুই দলের দ্বৈরথ হয়ে ওঠে সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং হাই-ভোল্টেজ। যার উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে মাঠের গন্ডি পেরিয়ে বিশ্বজুড়ে কোটি ভক্ত-সমর্থকের মাঝে। কোপা আমেরিকা বা প্রীতি ম্যাচে বহুবার দেখা হলেও ‘গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’ খ্যাত ফিফা বিশ্বকাপের ৯৬ বছরের ইতিহাসে চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী এই দুই দল মূল পর্বে মুখোমুখি হয়েছে মাত্র চারবার। বিশ্বকাপের সেই পরম আরাধ্য মঞ্চে মুখোমুখি লড়াইয়ের পরিসংখ্যানে আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলের মধ্যে কারা এগিয়ে, তা নিয়ে জল্পনা-কল্পনার শেষ নেই। বিশ্বকাপের মঞ্চে হেড-টু-হেড রেকর্ডে চিরশত্রু আর্জেন্টিনার চেয়ে কিছুটা এগিয়ে রয়েছে ব্রাজিল। চারবারের দেখায় ব্রাজিলের জয় দুটি, আর্জেন্টিনার একটি এবং বাকি ম্যাচটি ড্র। দুই দলের এই মহারণের সূচনা হয়েছিল ১৯৭৪ সালের পশ্চিম জার্মানি বিশ্বকাপে। দ্বিতীয় রাউন্ডের সেই ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে শুভসূচনা করেছিল ব্রাজিল। এর ঠিক চার বছর পর, ১৯৭৮ সালে আর্জেন্টিনার ঘরের মাঠে দ্বিতীয় রাউন্ডের ম্যাচটি তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতার পর ০-০ গোলে ড্র হয়। ১৯৮২ সালের স্পেন বিশ্বকাপে আবারও জ্বলে ওঠে সাম্বা জাদু। জিকো ও পাওলো ইসিদোরোদের পায়ের জাদুতে আর্জেন্টিনাকে ৩-১ গোলে বিধ্বস্ত করে ব্রাজিল। ম্যারাডোনার দেশের ভক্তদের জন্য সেই ম্যাচটি ছিল চরম হতাশা। তরুণ দিয়েগো ম্যারাডোনা লাল কার্ড দেখে মাঠ ছেড়েছিলেন ওই ম্যাচে। আর্জেন্টিনা তাদের সেই হারের মধুর প্রতিশোধ নেয় ১৯৯০ সালের ইতালি বিশ্বকাপে। শেষ ষোলোর সেই ঐতিহাসিক ম্যাচে ব্রাজিলের একের পর এক আক্রমণ সামলে ম্যাচের শেষভাগে ম্যারাডোনার জাদুকরী এক ডিফেন্স-চেরা পাস থেকে বল পেয়ে ক্লদিও ক্যানিজিয়ার করা একমাত্র গোলে ১-০ ব্যবধানে জয়ী হয়ে ব্রাজিলকে টুর্নামেন্ট থেকে বিদায় করে দেয় আর্জেন্টিনা। ১৯৯০ সালের পর বিশ্বকাপে আর কখনোই এই দুই দল মুখোমুখি হয়নি। সামগ্রিক ইতিহাসে ব্রাজিল দুটি জয় নিয়ে কিছুটা এগিয়ে থাকলেও, নকআউট পর্বে আর্জেন্টিনার সেই একমাত্র জয়টি ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা ক্লাসিক হিসেবে অমর হয়ে আছে। কারণ, জিকো-সক্রেটিসদের নিয়ে তখনকার ব্রাজিল দলটা ছিল অনেকটাই অপ্রতিরোধ্য। তাই কাগজে-কলমে ব্রাজিল এগিয়ে থাকলেও, বিশ্বকাপে দুই দলের শ্রেষ্ঠত্বের লড়াই আজও সমানে সমান রোমাঞ্চ ছড়ায়।

এবারের বিশ্বকাপে ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার মুখোমুখি হওয়ার জোরালো সম্ভাবনা রয়েছে, তবে তা শুধুমাত্র সেমিফাইনালে। টুর্নামেন্টের ড্র ও ফিক্সচার অনুযায়ী, নকআউট পর্বের আগে তাদের একে অপরের মুখোমুখি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। সেমিফাইনালে এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর মহারণ দেখতে হলে দুই দলকেই বেশ কিছু জটিল সমীকরণ পার করতে হবে। এ মধ্যে রয়েছে উভয় দলকেই গ্রুপ চ্যাম্পিয়ন হয়ে নকআউট পর্বে জায়গা করে নিতে হবে। পাশাপাশি শেষ ষোলো, রাউন্ড অব ৩২ এবং কোয়ার্টার ফাইনালের বাধা পেরিয়ে দুই দলকেই সেমিফাইনালে পৌঁছাতে হবে। এই শর্তগুলো পূরণ হলে, ফুটবল বিশ্ব সেমিফাইনালে এক ঐতিহাসিক ‘সুপার ক্লাসিকো’ দেখার সুযোগ পাবে। তাইতো ২০২৬ বিশ্বকাপের আলোচনায় অনেকেই এই দুই দলের লড়াই দেখার প্রত্যাশার কথা বলছেন। সেই লড়াইটা ফাইনাল হলে তো দর্শকদের প্রত্যাশার ষোলকলাই পূর্ণ হবে।