বিশ্ব অর্থনীতি আবারও এক অনিশ্চয়তার মোড়ে এসে দাঁড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশসহ প্রায় ৬০টি বাণিজ্য অংশীদার দেশের ওপর নতুন শুল্ক কার্যকর করার ঘোষণা দিয়েছে। অভিযোগ, এসব দেশ জোরপূর্বক শ্রম প্রতিরোধে যথেষ্ট কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারেনি। একই সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ পরিস্থিতি তীব্র হয়েছে এবং হরমুজ প্রণালি কার্যত অচল হয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এই দুটি ঘটনা আলাদা মনে হলেও বাস্তবে বৈশ্বিক বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতির জন্য তারা একই সূত্রে গাঁথা। বাংলাদেশের মতো আমদানি-নির্ভর এবং রপ্তানিমুখী অর্থনীতির জন্য এটি একটি বড় সতর্কবার্তা।
গত বছর মে মাসে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বিভিন্ন দেশের ওপর শুল্কারোপ করেন। বছর যেতেই আবার নতুন শুল্ক আরোপ করা হলো। তখন বলা হয়েছিল, পরোক্ষ করের চরিত্র অনুযায়ী তার চূড়ান্ত দায়ভার যুক্তরাষ্ট্রের ভোক্তাদের ওপর পড়বে। তা সত্ত্বেও ট্রাম্প কেন এ উদ্যোগ নিলেন? এটা নিয়ে নানা ধরনের বিশ্লেষণ আছে। নোবেলজয়ী মার্কিন অর্থনীতিবিদ পল ক্রুগম্যান, জোসেফ স্টিগলিটজসহ অন্যান্য অর্থনীতিবিদ ট্রাম্পের এ নীতির সমালোচনা করেছিলেন। তারা বলেন, ট্রাম্পের এ নীতির ফলে যুক্তরাষ্ট্রে আমদানি হ্রাস পাবে, ভোগ্যপণ্যের দাম বেড়ে যাবে, মুদ্রাস্ফীতি বাড়বে, প্রবৃদ্ধি থমকে যাবে, রাজস্ব হ্রাস পাবে, মার্কিন কর্তৃত্ব খর্ব হবে এবং সর্বোপরি বিশ্ব অর্থনীতিতে মহামন্দা দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশসহ ৫৭টি দেশের ক্ষেত্রে বিভিন্ন হারে এই শুল্ক আরোপ যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ও অন্যান্য দেশে কী ক্ষতি বয়ে আনতে পারে, তা জেনেশুনেই ট্রাম্প প্রশাসন সেই পথে হেঁটেছে। ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের ঘোষণা বাহ্যিকভাবে ‘খ্যাপাটে’ মনে হয়েছিল। তিনি কার্যত আবারো সেই খ্যাপাটে মনোভাবেরই পরিচয় দিলেন।
বার্তা সংস্থার খবরে বলা হয়েছে, চলতি বছরের শুরুতে অস্থায়ীভাবে আরোপ করা ১০ শতাংশ করের মেয়াদ শেষ হওয়ার দিন, অর্থাৎ শুক্রবার থেকেই এই শুল্ক কার্যকর হচ্ছে। গত বৃহস্পতিবার ট্রাম্প প্রশাসনের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা নতুন এ সিদ্ধান্তের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, গত ১৫০ দিনের জন্য কার্যকর থাকা অস্থায়ী ১০ শতাংশ বৈশ্বিক শুল্কের মেয়াদ শুক্রবার রাত ১২টা ১ মিনিটে শেষ হচ্ছে। ঠিক সে সময় থেকেই নতুন ট্যারিফ কার্যকর হবে। তবে একটি বিশেষ ছাড়ও রাখা হয়েছে। ২৮ জুলাই রাত ১২টা ১ মিনিটের আগে যেসব পণ্য যুক্তরাষ্ট্রের পথে রয়েছে, সেগুলো নতুন শুল্কের আওতার বাইরে থাকবে।
খবরে আরো বলা হয়েছে, নতুন এ সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গত বছর ক্ষমতায় আসার পর বিশ্ব বাণিজ্যে যে নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল, এটি তারই সবশেষ সংযোজন। চলতি বছরের শুরুতে মার্কিন সুপ্রিম কোর্ট রায় দিয়েছিল যে জরুরি ক্ষমতার আওতায় ট্রাম্প প্রশাসন বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন দেশে যে শুল্ক আরোপ করেছিল, তার আইনি বৈধতা ছিল না। এরপর থেকেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট তার প্রধান বাণিজ্য নীতি বাস্তবায়নের জন্য অন্যান্য আইনি পথ খুঁজতে শুরু করেন।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানে নতুন করে হামলা শুরু করেছে। ইরানও পাল্টা হামলা চালাচ্ছে মথ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মার্কিন ঘাঁটিতে। তারা হরমুজ প্রণালির ওপর নতুন করে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছে। ফলে বিশ্বে জ¦ালানি পরিস্থিতি আবার নাজুক হয়ে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে মার্কিন শুল্কারোপ ভাল বার্তা দিচ্ছে না, কোন শুভ লক্ষণও নয়।
আমরা মনে করি, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প প্রশাসন এর মধ্য দিয়ে যে মনোভাবের পরিচয় দিয়েছেন তা কোনমতেই বিশ্বের দেশসমূহের জন্য ভাল হতে পারে না। যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে উদ্বেগের কারণ। তবে সঠিক নীতি, কার্যকর কূটনীতি, শ্রমমানের উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক বহুমুখীকরণের মাধ্যমে এ সংকটকে মোকাবিলা করাই হবে ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। আমরা সে লক্ষ্যে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সরকারের কাছে আহ্বান জানাই।