বাংলাদেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা এক কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি। একদিকে ডেঙ্গুর বিস্তার, অন্যদিকে হামের উদ্বেগজনক সংক্রমণ, দেশের স্বাস্থ্যখাতকে একযোগে চাপে ফেলেছে। প্রতিদিন নতুন রোগী, বাড়তে থাকা মৃত্যুর সংখ্যা এবং হাসপাতালগুলোতে রোগীর ক্রমবর্ধমান চাপ স্পষ্ট করে দিচ্ছে যে এটি আর বিচ্ছিন্ন দুটি রোগের সমস্যা নয়; এটি একটি বহুমাত্রিক জনস্বাস্থ্য সংকট। গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে পাঁচজনের মৃত্যু এবং নতুন ১৭২ জনের হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার খবর উদ্বেগ বাড়িয়েছে। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও চার শিশুর মৃত্যু এবং এক হাজারের বেশি নতুন আক্রান্তের তথ্য পরিস্থিতির ভয়াবহতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। চলতি বছরের পরিসংখ্যান দেখলে বোঝা যায়, দুটি রোগই ধীরে ধীরে এমন একটি অবস্থায় পৌঁছেছে, যেখানে স্বাস্থ্যসেবার ওপর চাপ কেবল বাড়ছেই না, বরং তা ব্যবস্থাপনার সক্ষমতাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করাচ্ছে।
বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হলো, এ দুটি রোগের প্রকৃতি সম্পূর্ণ ভিন্ন হলেও তাদের বিস্তারের পেছনে একই ধরনের দুর্বলতা কাজ করছে। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে কার্যকর মশক দমন, নগর ব্যবস্থাপনা এবং জনসচেতনতার ঘাটতি যেমন দীর্ঘদিনের সমস্যা, তেমনি হামের বিস্তার আমাদের টিকাদান কর্মসূচি, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং রোগ নজরদারি ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার দিকেও আঙুল তুলছে। অর্থাৎ সংকটটি কেবল চিকিৎসার নয়; এটি প্রতিরোধমূলক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থারও সংকট।
সবচেয়ে বেশি উদ্বেগের বিষয় শিশুদের পরিস্থিতি। হামে আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে শত শত শিশুর মৃত্যু কেবল স্বাস্থ্যখাতের পরিসংখ্যান নয়, এটি একটি মানবিক বিপর্যয়। প্রতিটি শিশুমৃত্যু আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রতিরোধযোগ্য রোগে জীবন হারানো কোনো সভ্য সমাজের জন্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। একই সময়ে ডেঙ্গুর বিস্তারও পরিবারগুলোকে অনিশ্চয়তার মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। একটি পরিবারের একজন সদস্য অসুস্থ হলে তার চিকিৎসা ব্যয়, কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়া এবং মানসিক চাপ পুরো পরিবারকেই বিপর্যস্ত করে তোলে। জাতীয় পর্যায়ে এর অর্থ উৎপাদনশীলতা হ্রাস, অর্থনৈতিক ক্ষতি এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর অতিরিক্ত চাপ।
আরেকটি বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনও মূলত প্রতিক্রিয়াশীল। রোগ ছড়িয়ে পড়ার পর হাসপাতালের শয্যা বাড়ানো, অতিরিক্ত চিকিৎসক নিয়োগ কিংবা ওষুধ সরবরাহের উদ্যোগ নেওয়া হয়। অথচ আধুনিক জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার মূল দর্শন হলো প্রতিরোধ। রোগী হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই রোগের বিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা, ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সুরক্ষিত করা এবং স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়াই হওয়া উচিত প্রধান লক্ষ্য। এ সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগের বিকল্প নেই। স্থানীয় সরকার, স্বাস্থ্য বিভাগ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সিটি করপোরেশন, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজকে একই কৌশলের আওতায় কাজ করতে হবে। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও মশার প্রজননস্থল ধ্বংস যেমন অপরিহার্য, তেমনি হামের ক্ষেত্রে শতভাগ টিকাদান নিশ্চিত করা, দ্রুত রোগ শনাক্ত করা এবং আক্রান্ত শিশুদের যথাসময়ে চিকিৎসার আওতায় আনা সমান জরুরি। জনস্বাস্থ্যকে কেবল স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব হিসেবে দেখলে চলবে না; এটি রাষ্ট্রের সামগ্রিক প্রশাসনিক অগ্রাধিকারের বিষয়।
জলবায়ু পরিবর্তন, দ্রুত নগরায়ণ এবং জনসংখ্যার ঘনত্বের বাস্তবতায় ভবিষ্যতে সংক্রামক রোগের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। তাই সাময়িক অভিযান নয়, দীর্ঘমেয়াদি জনস্বাস্থ্য অবকাঠামো গড়ে তোলাই এখন সময়ের দাবি। রোগ নজরদারি, গবেষণা, পরীক্ষাগার সক্ষমতা, প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা এবং জরুরি সাড়া দেওয়ার ব্যবস্থাকে আধুনিক ও কার্যকর করতে হবে। একই সঙ্গে স্বাস্থ্যখাতে বরাদ্দ বৃদ্ধির পাশাপাশি সে অর্থের দক্ষ ও স্বচ্ছ ব্যবহারের নিশ্চয়তাও জরুরি। ডেঙ্গু ও হাম আজ আমাদের সামনে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা রেখে যাচ্ছে। একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার শক্তি কেবল বড় বড় হাসপাতাল নির্মাণে নয়; বরং রোগ প্রতিরোধ, সময়মতো সতর্কতা, কার্যকর সমন্বয় এবং মানুষের দোরগোড়ায় মানসম্মত স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়ার সক্ষমতায় নিহিত। বর্তমান সংকটকে যদি আমরা একটি সতর্কবার্তা হিসেবে গ্রহণ করি, তবে ভবিষ্যতের জন্য আরও শক্তিশালী জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব হবে। কিন্তু যদি এটিকেও কেবল মৌসুমি সংকট হিসেবে বিবেচনা করা হয়, তাহলে একই চিত্র আগামী বছরগুলোতেও ফিরে আসবে, হয়তো আরও ভয়াবহ রূপে।