॥ প্রফেসর আর. কে. শাব্বীর আহমদ ॥

এই বিশ্বজগতের স্রষ্টা, জীবন বিধানদাতা ও সার্বভৌম সত্তার মালিক একমাত্র আল্লাহ তা’আলা। তিনি মানুষ ও জিন জাতিকে সৃষ্টি করেছেন বুদ্ধিমান প্রাণী হিসেবে। তাদেরকে ভালো-মন্দ বিচারের বিবেক বুদ্ধি দিয়েছেন। সে অনুযায়ী কর্মের স্বাধীনতাও দিয়েছেন। মানুষ ইচ্ছে করলে ভালো কাজ করতে পারে আবার মন্দ কাজও করতে পারে। এতে আল্লাহ কোনো বাধা সৃষ্টি করেন না।

আল্লাহ তা’আলা মানুষের ভালো মন্দ কাজের হিসাব লিখনের জন্য সম্মানিত ফেরেশতাদের নিয়োগ করে রেখেছেন। আল্লাহ তাআলার ঘোষণা : ‘তোমাদের জন্য অবশ্যই সংরক্ষকগণ রয়েছেন। তারা সম্মানিত লেখকবৃন্দ। তারা জানে তোমরা যা কিছু করো।’ -সূরা আল ইনফিতার, আয়াত : ১০-১২

সম্মানিত ফেরেশতাগণ মানুষের কর্মের হিসাব সংরক্ষণ করেন। এ হিসাব সংরক্ষণই হবে মানুষের আমলনামা। আমলনামা অনুযায়ী আল্লাহ তায়ালা কাল হাশরের ময়দানে বিচার ফায়সালা করবেন।

দুনিয়ায় আল্লাহ তা’আলা মানুষকে তাঁর প্রতিনিধি হিসেবে ন্যায়ভিত্তিক বিচার ফায়সালা করার জন্য পাঠিয়েছেন। তারা অপরাধীদের অন্যায়-অশ্লীলতা, ব্যভিচার ও গর্হিত কাজের বিচার ফায়সালা করে জনসমক্ষে উপযুক্ত শাস্তি কার্যকর করবে। যাতে অন্যান্য অপরাধীরা এই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে, মৃত্যুদ-ের ভয়ে যাবতীয় অপরাধকর্ম থেকে বিরত থাকতে পারে। সমাজের মানুষেরা সুশৃংখল ও নিরাপদে বসবাস করতে পারে।

আল্লাহ তা’লার ঘোষণা করেছেন : ‘আর তোমরা ন্যায়বিচারের ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকো আল্লাহর উদ্দেশ্যে, ন্যায় সাক্ষীরূপে; যদিও তা তোমাদের নিজেদের অথবা পিতা-মাতা কিংবা আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে হয়।’ -সূরা আন-নিসা, আয়াত : ১৩৫

মানুষ হত্যা জঘন্য অপরাধ : িেনরপরাধ মানুষ ও নিষ্পাপ শিশুদের হত্যা করা জঘন্য অপরাধ। এই অপরাধের দ্রুত শাস্তি হওয়া অত্যন্ত জরুরি। না হয় এ ধরনের অপরাধ ধারাবাহিকভাবে সমাজে চলতে থাকবে। আর সমাজের মানুষেরা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে। সমাজ শৃঙ্খলা ভেঙে চুরমার হবে।

নিরপরাধ মানুষ হত্যার বিষয় ও পরিণতি সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলার স্পষ্ট ঘোষণা : ‘যে ব্যক্তি নিরপরাধ কোনো মানুষকে হত্যা করলো, সে যেন পৃথিবীর সমস্ত মানুষকে হত্যা করলো। আর যে ব্যক্তি নিরপরাধ, নিষ্পাপ কোনো মানুষের জীবন রক্ষা করলো, সে যেন দুনিয়ার সমস্ত মানুষের জীবন রক্ষা করলো।’ - সূরা আল মায়েদাহ, আয়াত : ৩২

যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুমিনকে হত্যা করে, তার শাস্তি হচ্ছে জাহান্নাম। সেখানে সে চিরকাল শাস্তি ভোগ করতে থাকবে। তার উপর আল্লাহর গজব ও লা’নত দুনিয়া-আখিরাতে অবধারিত। -সূরা আন নিসা, আয়াত : ৯৩

গুম খুন ধর্ষণ অমার্জনীয় অপরাধ : সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশে নিষ্পাপ শিশু ও নিরীহ নারীদের অবাধে ধর্ষণ ও হত্যাকা- সংগঠিত হচ্ছে। রামিসা আসিয়ার মতো হাজারো নিষ্পাপ শিশু ও বয়স্ক নারীরা ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হচ্ছে। এসব গর্বিত অপরাধ ও নৃশংস কর্মকা-ের দ্রুত যথাযথ দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কার্যকর না হওয়ায় প্রতিনিয়ত লোমহর্ষক অপরাধকা- বেড়েই চলেছে।

এ হেন বর্বর, হিংস্রতম, নৃশংস, তা-বলীলায় বর্তমান সরকার প্রশাসনের কার্যকরী ভূমিকা পরিলক্ষিত হচ্ছে না। যার ফলে অপরাধীরা নির্বিঘেœ অপরাধকা- চালিয়ে যাচ্ছে। দেশে অপরাধ প্রবণতা দ্রুত থেকে দ্রুততর বৃদ্ধি পাচ্ছে। মানুষের জান মাল ইজ্জত আব্রুর কোনো নিরাপত্তা নেই।

এমন অস্বস্তিকর, নাজুক পরিস্থিতিতে সচেতন জনগোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিবাদে সোচ্চার হতে হবে। সরকার প্রশাসনকে সঠিক তদন্তের মাধ্যমে নিরপেক্ষভাবে অপরাধীদের বিচারকার্য সম্পাদন করতে হবে। তাহলে সমাজে অপরাধপ্রবণতা হ্রাস পাবে। মানুষ নিরাপদে বসবাস করতে পারবে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য সংরক্ষণ ও শুদ্ধসংস্কৃতি চর্চা অবাধ ও কল্যাণকর হবে।

মানবজাতির কল্যাণের জন্যই আল্লাহর আইনে বিচার ফায়সালা : আল্লাহ তাআলা মানব জাতিকে সৃষ্টি করে তাদের জীবন চলার পথকে সুন্দর ও নিরাপদ করার জন্য সুনির্দিষ্ট নীতিমালা প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ তাআলার ঘোষণা: ‘সৃষ্টি যার আইনও চলবে তাঁর।’ -সূরা আল আ’রাফ, আয়াত :৫৪

‘বিচার ফায়সালা চলবে একমাত্র আল্লাহর আইনের ভিত্তিতে।’ -সুরা ইউসুফ, আয়াত : ৪০

‘যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুযায়ী বিচার- ফায়সালা করে না, তারা আল্লাহর বিধান গোপনকারী, সীমালংঘনকারী। -সূরা আল মায়েদাহ, আয়াত : ৪৪

আল্লাহ তাআলা মানুষকে পৃথিবীতে পাঠিয়েছেন। সাথে সাথে জীবন বিধানও পাঠিয়েছেন। আল্লাহ তা’আলা ঘোষণা করেছেন : ‘আমরা বললাম তোমরা জান্নাত থেকে নেমে যাও। অতঃপর যখন আমার পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে কোনো জীবন-নির্দেশিকা পৌঁছবে, তখন যারা আমার এই নির্দেশিকা অনুসরণ করে জীবন পরিচালনা করবে, (বিচার ফায়সালা করবে) তাদের জন্য কোনো ভয় নেই এবং তারা কখনও চিন্তাগ্রস্ত হবে না।’ -সূরা আল বাকারা আয়াত : ৩৮

আমাদেরকে এ বিষয়ে দৃঢ় বিশ্বাস ও প্রত্যয় রাখতে হবে যে, ইসলাম শুধু ব্যক্তিগতভাবে কিছু আমল আখলাকের নাম নয়, এটি সমষ্টিগতভাবে মানুষের জন্য একটি স্বাভাবিক ও পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। সামষ্টিক জনগোষ্ঠীর স্বার্থেই ইসলাম রাষ্ট্রীয় জীবনব্যবস্থার কথা বলে।

আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় ইসলামের তিনটি বিভাগ রয়েছে। আইন বিভাগ, নির্বাহী বিভাগ ও বিচার বিভাগ। এ বিভাগগুলো কুরআন ও সুন্নাহর নির্দেশনা অনুসরণে কর্মপন্থা নির্ধারণ করে। ইসলামী আইনের ভিত্তিতে নির্বাহী বিভাগ দেশ পরিচালনা করবে এবং বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে বিচারকার্য পরিচালনা করবে। অপরাধ প্রবণতারোধ, আইন শৃঙ্খলা রক্ষা ও সামাজিক নিরাপত্তাও বিধান করবে নির্বাহী বিভাগ।

আইনের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সমাজে শান্তি, নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা স্থাপন করা। যাতে জনগণ তাদের অধিকার নিয়ে নির্বিঘেœ সমাজে বসবাস করতে পারে।

তারপরেও সমাজে যদি কোনো অপরাধ সংগঠিত হয় তাহলে এর যথার্থ শাস্তির ব্যবস্থা ইসলামী আইন ও বিচার বিভাগে রয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অপরাধের শাস্তি কার্যকর করতেন জনসমক্ষে আল্লাহর নির্দেশ অনুযায়ী।

চুরি, ডাকাতি, অন্যের সম্পদ লুটতরাজকারীদের শাস্তির বিধান আল্লাহ তা’আলা এমনভাবে দিয়েছেন, যাতে এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত করার সাহস আর কেউ না পায়। আল্লাহ তা’আলার ঘোষণা : ‘চোর পুরুষ হোক বা নারী হোক তার হাত কেটে দাও তার অপকর্মের শাস্তি হিসেবে।’ -সূরা আল মায়েদাহ,আয়াত : ৩৮

সাম্প্রতিক সময়ে আমাদের সমাজে ব্যাপকহারে নির্বিঘেœ পশুর চাইতেও নিকৃষ্ট অমানুষেরা নিষ্পাপ শিশু থেকে পরিণত বয়সের নারীদেরকে নৃশংস ও পাশবিক কায়দায় ধর্ষণ করে হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ সংঘটিত করছে। কিন্তু এ ধরনের হিংস্রতা ও পাশবিকতার শাস্তি কার্যকর না হওয়ায় জঘন্য অপরাধগুলো অহরহ চলছে।

যিনা, ব্যভিচার বা ধর্ষণকারীদের শাস্তি আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু ওয়া সাল্লাম দৃষ্টান্তমূলকভাবে উন্মুক্ত ময়দানে জনতার সামনে কার্যকর করতেন কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী যথার্থ সাক্ষ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে।

নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে ব্যভিচারের (যিনা) শাস্তি হিসেবে ‘রজম’ বা পাথর নিক্ষেপে মৃত্যুদ-ের বিধান জনসম্মুখে কার্যকর করার দুটি ঐতিহাসিক ঘটনা বিশুদ্ধ হাদিস গ্রন্থগুলোতে (যেমন : সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম) বিস্তারিতভাবে বর্ণিত আছে। এই শাস্তিগুলো অত্যন্ত কঠোর শর্তসাপেক্ষে, অপরাধীর বারবার নিজের দোষ স্বীকার করার পর এবং অপরাধ প্রমাণের ভিত্তিতে দেওয়া হয়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগে জনসম্মুখে ব্যভিচারের শাস্তি কার্যকর করার ঘটনা দুটি হলো:

১. হযরত মায়েয ইবনে মালেক (রা.)-এর ঘটনা

অপরাধ স্বীকার : মায়েয ইবনে মালেক আল-আসলামী রাদিআল্লাহু আনহু নামক একজন সাহাবী রাসুলের (সা.) দরবারে উপস্থিত হয়ে নিজে যিনা বা ব্যভিচার করার কথা স্বীকার করেন এবং নিজেকে পবিত্র করার (শাস্তি দিয়ে পাপমুক্ত করার) আবেদন জানান [১.২.]

শাস্তি প্রদান : রাসুল (সা.) প্রথমে তাকে ফিরিয়ে দেন এবং তার মানসিক অবস্থা ঠিক আছে কিনা তা যাচাই করতে বলেন। তিনি বারবার ফিরে এসে নিজের অপরাধের কথা স্বীকার করতে থাকেন [১.২.]। চূড়ান্তভাবে তার ওপর পাথর নিক্ষেপের (রজম) শাস্তি কার্যকর করার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং সাহাবীদের উপস্থিতিতে তা কার্যকর করা হয় [১.২.]।

২. জুহাইনা গোত্রের মহিলার ঘটনা

অপরাধ স্বীকার : জুহাইনা গোত্রের একজন নারী সাহাবী রাসুল সা.এর কাছে এসে জানান যে, তিনি ব্যভিচারের কারণে গর্ভবতী হয়েছেন এবং তাকে শাস্তি দেওয়ার অনুরোধ করেন।

শাস্তি প্রদান : রাসুল (সা.) তাকে তার সন্তান প্রসব হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বলেন। সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর যখন তার শিশুটি স্তন্যপান ত্যাগ করে, তখন সে পুনরায় শাস্তি কার্যকরের জন্য আবেদন জানায়। এরপর রাসুল সা.এর নির্দেশেই জনসম্মুখে পাথর মেরে হত্যা করে তার শাস্তি কার্যকর করা হয় ।

হাদিসে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, এই শাস্তিগুলো সমাজে অপরাধের প্রসার রোধ করতে এবং আল্লাহর নির্ধারিত আইন হিসেবে কার্যকর করা হয়েছিল। [বুখারী, মুসলিম]

আমাদের সমাজের সংগঠিত গুম, খুন, পাশবিক নির্যাতন, ও ধর্ষণের যথার্থ সাক্ষ্য প্রমাণ পাওয়ার পর সুনির্দিষ্ট সময়ে শাস্তি কার্যকর হলে সমাজ থেকে দ্রুত অপরাধ প্রবণতা দূর হয়ে যাবে।

কুরআন সুন্নাহ ভিত্তিক ইসলামী আইনের অবমাননা, নিরপরাধ মানুষের উপর মিথ্যা অপবাদ প্রচার, দেশ ও দেশের স্বাধীনতা বিরোধী কর্মকা- পরিচালনা, আধিপত্যবাদ ও ফ্যাসিবাদ এর দোসর হয়ে দেশে অরাজকতার সৃষ্টি ও স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব বিনষ্ট করার মতো জঘন্য অপরাধগুলো নির্মূলের জন্য দ্রুত আইন বিভাগ ও সরকার প্রশাসনের বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ কার্যকর হলে দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব রক্ষা পাবে। সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠিত হবে।

জননিরাপত্তা নিশ্চিত হলে সমাজে বসবাসরত জনশক্তি তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী দেশকে সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য আত্মনিয়োগ করতে পারবে।

আমরা সাম্প্রতিককালে সংঘটিত নৃশংস অপরাধ যেমন-ধর্ষণ, হত্যা, জনঅধিকার ও জনসম্পদ লুণ্ঠন, ইসলামী আইনের প্রতি কটাক্ষ ও অবমাননা, নিরপরাধ মানুষের উপর অহেতুক অপবাদ প্রচার, ইসলামী ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংক ও সংস্থা থেকে জনসাধারণের আমানত লুটপাটের মতো সমাজবিধ্বংসী কর্মকা-ের দ্রুত বিচার কার্যকর করার জন্য নির্বাহী বিভাগ, আইন বিভাগ ও সরকার প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি। যাতে আমাদের এই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশটি চির আধিপত্যবাদমুক্ত, ন্যায়-ইনসাফ ভিত্তিক একটি কল্যাণরাষ্ট্রে পরিণত হয়।

লেখক : প্রাবন্ধিক, কবি ও গীতিকার।