মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত দীর্ঘায়িত হওয়ায় জ্বালানি তেল ও সারের সরবরাহ ব্যাহত হয়ে বিশ্বে খাদ্য সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দীর্ঘস্থায়ী হলে বিশ্বজুড়ে আরও কয়েক কোটি মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটে পড়তে পারে- এমন ‘নৈরাশ্যজনক’ পূর্বাভাস বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে বলে শুক্রবার জানিয়েছে জাতিসংঘ। জেনেভা থেকে বার্তা সংস্থা এএফপি এ খবর জানায়।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলার পর সংঘাতের সূচনা হয়। এতে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে অস্থিরতা দেখা দেয়। এর কয়েক সপ্তাহ পর জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি (ডব্লিউএফপি) সতর্ক করে বলেছিল, তেলের ঊর্ধ্বমুখী দাম বিশ্ব খাদ্যনিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি হয়ে উঠবে।
ডব্লিউএফপি মার্চে সতর্ক করেছিল, জুনের শেষ পর্যন্ত অপরিশোধিত তেলের দাম যদি ব্যারেলপ্রতি প্রায় ১০০ ডলারে স্থির থাকে, তাহলে বিশ্বজুড়ে আরও প্রায় ৪ কোটি ৫০ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্যসংকটের মুখে পড়বে।
এরা চলতি বছরের শুরুতে খাদ্যনিরাপত্তাহীন হিসেবে চিহ্নিত প্রায় ৩২ কোটি মানুষের সঙ্গে যুক্ত হবে বলে সংস্থাটি জানিয়েছিল।
তীব্র বাকযুদ্ধ ও সহিংসতার বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে কয়েক সপ্তাহ ধরে জটিল আলোচনা চললেও যুদ্ধ বন্ধ এবং তেল সরবরাহের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়ার বিষয়ে কোনো সমঝোতা হয়নি।
সংঘাত শুরুর প্রায় তিন মাস পর ডব্লিউএফপি’র খাদ্য ও পুষ্টি বিশ্লেষণ বিভাগের পরিচালক জ্যাঁ-মার্টিন বাউয়ার এএফপিকে বলেন, ‘দুর্ভাগ্যজনকভাবে নেতিবাচক পরিস্থিতির পূর্বাভাস এখন বাস্তবে রূপ নিচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকায় ক্ষুধা বাড়ছে।’ চাল ও গমের মতো নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির দিকেও তিনি ইঙ্গিত করেন।
বাউয়ার বলেন, ‘বছরের শুরুতে যে নৈরাশ্যজনক পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল, তা এখন সত্যি হতে শুরু করেছে। আমাদের দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।’
ডব্লিউএফপি’র বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, জ্বালানি, খাদ্যমূল্য ও আয়সংক্রান্ত ধাক্কা এবং বাণিজ্যিক বিঘেœর মাধ্যমে এ সংকটের ব্যাপক প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, এসব বিষয় আগে থেকেই বিদ্যমান দুর্বলতার সঙ্গে যুক্ত হয়ে দ্রুত খাদ্যনিরাপত্তা ও মানুষের জীবিকায় দৃশ্যমান প্রভাব ফেলছে।
সংস্থাটি বিভিন্ন মাত্রায় সংকটের প্রভাব পড়া কয়েকটি দেশের পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করেছে। এর মধ্যে সোমালিয়ায়, বছরের শেষ নাগাদ আরও ২৫ লাখ মানুষ ন্যূনতম খাদ্যসামগ্রী কেনার সামর্থ্য হারাবে বলে পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছে।
ডব্লিউএফপি’র মতে, আফ্রিকার হর্ন অঞ্চলের অস্থিতিশীল দেশটিতে প্রায় ৬০ শতাংশ পরিবার প্রয়োজনীয় চাহিদা পূরণে অক্ষম হবে। ২০২৫ সালে এ হার ছিল ৪৭ শতাংশ।
বাউয়ার সতর্ক করে বলেন, ‘পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে, তাতে ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার ইউক্রেন আগ্রাসনের পর যে বৈশ্বিক জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট দেখা দিয়েছিল, তার পুনরাবৃত্তি ঘটতে পারে।’
তবে এবার পরিস্থিতি আরও কঠিন। কারণ তখন সক্রিয় থাকা মানবিক সহায়তা ব্যবস্থা এখন বৈশ্বিক তহবিলের বড় ধরণের কাটছাঁটের কারণে চাপে রয়েছে। বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউসে প্রত্যাবর্তনের পর এ চাপ বেড়েছে।
বাউয়ার বলেন, ‘২০২২ সালে মানবিক কর্মসূচিগুলোর অর্থায়ন তুলনামূলক ভালো ছিল। তখন মানবিক সহায়তা কর্মীরা যেসব এলাকায় কাজ করতেন, এখন অনেক জায়গায় তারা আর নেই।’
এর পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধজনিত পরিবহন জটিলতা ও মূল্যস্ফীতিও বিশ্বব্যাপী ত্রাণ কার্যক্রমকে কঠিন করে তুলেছে।
ডব্লিউএফপি’র বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, ‘মানবিক সহায়তা ব্যবস্থা এখন দ্বিমুখী চাপে পড়েছে। একদিকে প্রয়োজন বাড়ছে, অন্যদিকে সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ব্যয়ও বাড়ছে। ফলে সহায়তা প্রদানে ঘাটতি তৈরি হচ্ছে।’
সংস্থাটি জানায়, ২০২৬ সালে তাদের মূল পরিকল্পনার তুলনায় ১৫ লাখ কম মানুষকে সহায়তা দেওয়া সম্ভব হবে।
ডব্লিউএফপি সতর্ক করে বলেছে, সংঘাত যদি ছয় মাস স্থায়ী হয়, তাহলে ৯০ লক্ষাধিক মানুষ মানবিক সহায়তা হারাতে পারেন।
বাউয়ার বলেন, সোমালিয়ায় কয়েক মাসের মধ্যেই বিতরণের জন্য ডব্লিউএফপি’র খাদ্য মজুত প্রায় শেষ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘খাদ্যনিরাপত্তার দিগন্তে কালো মেঘ জমছে।’