ইসলামী ব্যাংক ইস্যুতে উত্তপ্ত হয়েছে জাতীয় সংসদ। আওয়ামী লীগ আমলে সরকারি সংস্থার মাধ্যমে জোরজবরদস্তি করে এস আলম গ্রুপ ব্যাংকের শেয়ার ডাকাতি করে নিয়ে যায়। এ শেয়ার মূল মালিকদের ফিরিয়ে দেয়ার দাবিতে সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের মধ্যে বির্তক হয়। ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও এমডিকে সরিয়ে নতুন চেয়ারম্যান বসিয়ে এস আলম গ্রুপের পথই এ সরকার অবলম্বন করছে বলে বিরোধী দলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে। তবে সরকার দলের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, ব্যাংকে গতিশীলতা আনয়ন করা ও ব্যাংকের মূল মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেয়ার জন্য সরকার পদক্ষেপ নিচ্ছে। গ্রাহকদের টাকার আমানত রক্ষা করা হবে বলে সরকার দলের পক্ষ থেকে আশ্বস্ত করা হয়।

গতকাল মঙ্গলবার জাতীয় সংসদে কার্যপ্রণালি বিধি ৬৮ অনুযায়ী বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান প্রস্তাব করেন, “দেশের অর্থনীতি, ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতা এবং কোটি কোটি গ্রাহকের স্বার্থ রক্ষার লক্ষ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের শেয়ারসমূহ বৈধ ও প্রকৃত মালিকদের নিকট প্রত্যর্পনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ব্যাংকের ব্যবস্থাপনায় সকল প্রকার অন্যায়, অযৌক্তিক ও অনভিপ্রেত হস্তক্ষেপ অবিলম্বে বন্ধ করে দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে এর গুরুত্বপূর্ণ অবদান অব্যাহত রাখার স্বার্থে আলোচনা” প্রসঙ্গে সংক্ষিপ্ত আলোচনা হয়। আলোচনায় অংশ গ্রহণ করেন অর্থ মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমেদ, বিরোধীদলীয় উপ নেতা ডা. আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের, সাইফুল আলম খান মিলন, মার্জিয়া মমতাজ, নূরুন্নিসা সিদ্দিকা।

ডা. শফিকুর রহমান বলেন, আমার মূল বক্তব্যে যাওয়ার আগে মাননীয় সংসদ সদস্য এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী খুব চমৎকার চমৎকার কিছু কথা বলেছেন। এগুলো একটু স্মরণ করতে চাই। উনি বলেছেন যে, শেয়ারহোল্ডারই শেয়ারহোল্ডার। সে কীভাবে শেয়ারহোল্ডার হয়েছে, এটা পরে দেখা যাবে। এটা পরে কেন? এটা তো আগেই এক্সপোজ হয়ে গিয়েছে। সারা দুনিয়া জানে উনি জানেন না উনার মতো একজন বিজ্ঞ মানুষ, আমি এটা বিশ্বাস করি না।

তিনি এস আলম গ্রুপকে উদ্দেশ্য করে বলেন, ইসলামী ব্যাংক থেকে উনি একা নিয়েছেন তার নিজের নামেই ৮২ হাজার কোটি টাকা। আর তার সমুদয় শেয়ার যেগুলো তিনি কিনেছেন, ৮২% এর মালিক হয়ে গিয়েছেন, এগুলোর মূল্য হচ্ছে মাত্র ১২ হাজার কোটি টাকা। অর্থাৎ, তিনি কইয়ের তেল দিয়ে শুধু কই ভাজেন নাই, কইও ভাজছেন শোল মাছও ভাজছেন। এবং সবগুলা ব্যাংক থেকে ডাকাতি করার টাকা। সেই শেয়ারগুলা কীভাবে হস্তান্তর হয়েছে, তিনি একটা প্রতিষ্ঠানের নাম এখানে বলেছেন। সবগুলা বলে দিলে ভালো হইতো। এই ধরনের সকল শেয়ারহোল্ডারের উপরে বিশেষ একটা এজেন্সির মাধ্যমে প্রচণ্ড চাপ ক্রিয়েট করে তাদেরকে বাধ্য করা হয়েছে তাদের শেয়ার হস্তান্তর করতে। এরা তো হস্তান্তরের জন্য এই শেয়ারগুলা কিনে নাই। তারা যুগ যুগ ধরে এই ব্যাংকের সাথে। এবং যথারীতি এই ব্যাংক সবাইকে স্যাটিসফ্যাক্টরি সার্ভিস দিয়ে চলছিল, ডিভিডেন্ড দিয়ে চলছিল। একটা মাত্র ব্যাংক যে ব্যাংক তারল্য সংকটে অন্য ব্যাংককেও হেল্প করত। কীভাবে ব্যাংকটা ডাকাতি করে আজকে এটাকে একদম দেউলিয়া করা হয়েছে? এটা করেছে ফ্যাসিস্ট সরকার। উনি কর্মচারীদের নিয়োগের ব্যাপারে কথা বলেছেন। ১০ হাজার কর্মচারীকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে সামান্য কোনো নিয়মনীতি মানা হয়নি। পত্রিকায় একটা বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়নি। এই ব্যাংকের সমস্ত অতীত ট্র্যাডিশন ভঙ্গ করে কোনো পরীক্ষা ছাড়াই তাদেরকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। একটা কাগজে কেউ না কেউ সই করে দিয়েছে, এইটাই তার নিয়োগ লেটার।

তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংকের এসব ঘটনা ফ্যাসিস্ট আমলে। কিন্তু সালাউদ্দিন সাহেব একটা অংশ এনেছেন, আরেকটা অংশ আনেন নাই। সরকার পরিবর্তন হওয়ার পরে, ৫ আগস্টের পরে আমরা যতটুকু জানতে পেরেছি যে তাদের সকলকে আবার পরীক্ষায় আসার জন্য ইনভাইট করা হয়েছিল যে আসেন, বিনা পরীক্ষায় আপনারা চাকরি নিয়েছেন, মিনিমাম নিয়মটা মেনে এখন আপনারা চাকরিতে ফিরে আসেন। তারা কেউ আসেনি। কেন তারা আসলো না?

তিনি আরো বলেন, এই ব্যাংকটা ১৯৮৩ সালের নভেম্বরের তিনটা শাখা দিয়ে বাংলাদেশে তার কার্যক্রম শুরু করে। ঢাকার লোকাল ব্রাঞ্চ, মতিঝিলে; আগ্রাবাদ, চিটাগাং; তালতলা, সিলেট। পর্যায়ক্রমে তাদের সততা, দক্ষতা, আমানতদারী এবং গ্রাহকদের প্রতি তাদের সেবার মান, এগুলার কারণে অনন্য উচ্চতায় এই ব্যাংকটা চলে যায়। তিনি (স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী) যে সমস্ত অভিযোগ আনলেন, যে কোনো একটা দলের দিকে ইঙ্গিত করে, একেবারে নাম বলে দিলেই পারতেন জামায়াতে ইসলামী। উনি বলছেন যে মাঝে মাঝে নেকাব খোলা ভালো, এটাও খুলে দিতেন। এখানে নেকাব রাখলেন কেন উনি? যে এখান থেকে ৭০০ কোটি টাকার লোন কে নিয়েছে, এইটা কোনো একটা দলের নির্বাচনী ফান্ডে ফান্ডিং করা হয়েছে। আমি এটা পরিষ্কার জানতে চাই, উনি জামায়াতকে এটার দ্বারা মীন করেছেন কি না? যদি উনি মীন করে থাকেন, আই এম টেকিং অ্যাবসোলিউট চ্যালেঞ্জ। তিনি এটা প্রমাণ করতে পারলে আমি তাকে একটা মেডেল দিব পার্সোনালি। এরপরে কার ছেলে, কার নাতি, কোন কোম্পানি শুধু ইসলামী ব্যাংক না, যেকোনো ব্যাংক থেকে চুরির টাকাটি অসততার মাধ্যমে কিছু নিয়ে যদি আত্মসাৎ করে থাকে, তার ব্যাপারে অবশ্যই তদন্ত করে স্টার্ন অ্যাকশন দেশের বিদ্যমান আইনে নেওয়া উচিত। এটা আমি শফিকুর রহমান হলে আমাকেও যেন স্পেয়ার করা না হয়।

বিরোধী দলের নেতা বলেন, এই ব্যাংকটিতে ক্ষুদ্র একজন ব্যবসায়ী হিসাবে আমার বসার সুযোগ হয়েছিল ২০০৫ থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ছয় বছর। ব্যাংকের বোর্ডে বসতাম, শিখতাম, জানতাম, বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বুঝার চেষ্টা করতাম। সেই সময়টায় এই ব্যাংক এককভাবে বৈদেশিক রেমিট্যান্সের ৩২% পর্যন্ত আর্ন করত। তার ডিপোজিট, তার তারল্য, তার ইনভেস্টমেন্ট, সকল টার্নওভারে ইমপ্যারালাল একটা ব্যাংক ছিল। সবগুলো সরকারি ব্যাংক মিলেও তার সমতুল্য ছিল না। কিন্তু তখন বয়ান বানাতেন একজন বিশেষ অর্থনীতিবিদ ডক্টর আবুল বারাকাত। তিনি বলতেন এখান থেকে জামায়াতে ইসলামী হাজার হাজার কোটি টাকা নিয়ে যাচ্ছে। আর এই বয়ানের ভিত্তিতেই শেষ পর্যন্ত এই ব্যাংকে অভ্যুত্থান করা হলো, দখল করা হলো। সাড়ে ১৫ বছর দুঃশাসন চালানো হলো। কৈ? প্রমাণ কোথায়? সাড়ে ১৫ বছর তো কম না। এখনও আবার একই তালে যদি কথা বলা হয়, আমি বলব আমরা কি আবার সেকেন্ড আবুল বারাকাত হতে যাচ্ছি? আন্দাজ-অনুমানের ভিত্তিতে কোন মহিলার কোন কোটেশন সংসদের মতো একটা প্রেস্টিজিয়াস জায়গায়, এগুলো আসলে আমরা আশা করি না। ঐ মহিলাকে সংসদে হাজির করা হোক। যদি কোন প্রভিশন থাকে, সংসদে গণশুনানিও হোক। অসুবিধা নাই। আরডিএস প্রকল্প কোন দলের নয়, কোন ধর্মেরও নয়। আমি নিজে বোর্ডে ছিলাম, আমি জানি। এখানে বিভিন্ন ধর্মের মানুষ এখান থেকে বেনিফিশিয়ারি। এখানে দল-ধর্ম দেখা হয় না, এখানে টার্গেট গ্রুপকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ১১ হাজার কোটি টাকার একটা রেফারেন্স দিয়েছেন, কে নিয়েছে এইটা? আমি? আমার সহকর্মীরা? যদি এইরকম হয়, দলের ফান্ডে যদি ১ টাকাও আসে, আমি বলব সার্চ লাইট দিয়ে এইটা তালাশ করে আমাদের বিরুদ্ধে যেন অভিযোগ আনা হয়।

বিরোধীদলীয় নেতা আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, ব্যাংকে পরিবর্তন যেকোনো সময় আসতেই পারে। ব্যাংকের স্বার্থে আসতে হবে, গ্রাহকের স্বার্থে আসতে হবে, মালিকের স্বার্থে আসতে হবে। আমি এই ব্যাংকের একজন মালিক। আমার ১০ টাকা মূল্যের একটা শেয়ার আছে। আমি আমার এই শেয়ারের দাবি কখনো ছেড়ে দেব না। আমার এই ১০ টাকা মূল্যের শেয়ারের পক্ষে আমি, আমার রাইট ধরে রাখার জন্য, এস্টাবলিশ করার জন্য যা করা দরকার তাই আমাকে করতে হবে। আমি তার রাজনৈতিক পরিচয় করব না, আমি করব এই ব্যাংকের একজন গ্রাহক হিসাবে, একজন মালিক হিসাবে। এইভাবে রাজনৈতিক পরিচয় থাকা কোন দোষের বিষয় নয়। আর এই ব্যাংকের গ্রাহক শুধু জামায়াতে ইসলামীর মানুষরাই নয়, এই ব্যাংকের গ্রাহক বিএনপিরও বহু লোক আছেন। আমার পরিচিত অনেক লোক আছেন। অন্যান্য দলের আছেন, অন্যান্য ধর্মের আছেন। এটা সকলের ব্যাংক। এই ব্যাংক একক কারও না। ঐ ব্যাংকের গায়ে লেখা নাই যে এই ব্যাংক এরাই শুধু সুবিধা নিবে বাকিরা পারবে না, এরাই শুধু গ্রাহক হতে পারবে বাকিরা পারবে না। এই ধরনের কিছু লেখা নাই। এগুলো হলো বানোয়াট বয়ান।

তিনি বলেন, ব্যাংকটাকে ধ্বংস করেছেন শেখ হাসিনা, এস আলমকে তার হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে। আমরা এখন স্পষ্টত দেখতে পাচ্ছি সেই এস আলমকেই আবার ফিরে আসার পথ করে দেওয়া হচ্ছে। এর প্রমাণ এই যে ডেপুটি গভর্নর বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক, তিনি রংপুরের রিজিওনাল ম্যানেজার থাকা অবস্থায়, ডিরেক্টর থাকা অবস্থায় অনিয়মের ৫২ লাখ টাকার অভিযোগ তার বিরুদ্ধে প্রমাণিত হয়েছে। তাকে তখন শাস্তি দেওয়া হয়েছে। আর ৫ আগস্টের পর তিনি স্বৈরাচারের দোসর এবং দুষ্কৃতকারী হওয়ার কারণে তিনি শেষ পর্যন্ত এখান থেকে বাধ্য হয়েছেন চলে যেতে। সেই লোকটাকে এনে এখানে বসানো হলো। তিনি যখন ডেপুটি গভর্নর, তখন এস আলমের সকল অপকর্মের তিনি ছিলেন সহযোগী। এবং সেই হিসাবে তিনি একটা প্রাইস পেয়েছিলেন। তার স্ত্রীর নামে ভুয়া কোন প্রতিষ্ঠানের অস্তিত্ব নেই, সেখানে সাড়ে ৩ কোটি টাকা এক্সিম ব্যাংক থেকে গিফট লোন দেওয়া হয়েছে তাকে। তিনি অসৎ। সেই লোকটাকে এনে একটা বিধ্বস্ত ব্যাংকের মাথার উপর বসায়ে দেওয়া, এটা কোন যুক্তিতেই মেনে নেওয়া যায় না।

তিনি আরো বলেন, সরকার অবশ্যই সবকিছু চালাবেন, ক্রেডিট হলেও সরকারের, ডিসক্রেডিট হলেও সরকারের। কিন্তু জনগণের পারসেপশনটা কী এই ব্যাংক নিয়ে, এটা অবশ্যই সরকারকে বিবেচনায় নিতে হবে বলে আমি মনে করি। সরকার বিবেচনায় নিলে দেশ লাভবান হবে, জাতি লাভবান হবে। ইসলামী ব্যাংক কোনো কারণে যদি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি বাংলাদেশের অর্থনীতি মাটির সাথে বসে যাবে। আস্থার এটি একটা পিরামিড। এই পিরামিড হেলে পড়লে অথবা বিধ্বস্ত হয়ে গেলে ব্যাংকিং ব্যবস্থার উপরেই মানুষের অনাস্থা তৈরি হবে। এবং এই অনাস্থা বাংলাদেশের জন্য কোন ভালো বার্তা বয়ে আনবে না। যারা রেমিটার, তাদের কষ্টে অর্জিত টাকা বাংলাদেশে পাঠায় পরিবারের জন্য, দেশবাসীর জন্য। তাদের মধ্যেও এখন অস্থিরতা তৈরি হয়েছে। আমি হজের সফরে মাত্র ১১ দিনের জন্য গিয়েছিলাম, সেখানে এই ব্যাপারে অনেকের উদ্বেগ, সরাসরি প্রশ্ন শোনার সুযোগ পেয়েছি। এতে দেশের অর্থনীতিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।

তিনি আরো বলেন, রেমিট্যান্স প্রবাহ যদি বাধাগ্রস্ত হয়, আমাদের মাত্র দুইটা সোর্স। একটা রেমিট্যান্স, আরেকটা হচ্ছে আরএমজি। আরএমজিও এখন বিভিন্ন চ্যালেঞ্জের ভিতর দিয়ে অতিক্রম করছে। রেমিট্যান্সও যদি বিপদে পড়ে যায়, তাহলে আমাদের দেশের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে কোথায় দাঁড়াবে, মাননীয় স্পিকার? এই সবগুলোই তো আমরা বিপদে পড়ে যাব। এইজন্য আমরা অনুরোধ করব, জোরজবরদস্তি করে যাদের কাছ থেকে এই শেয়ারগুলো ডাকাতি করে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, অনতিবিলম্বে সসম্মানে সেই মূল্যেই তাদের কাছে আবার শেয়ারগুলো ফিরিয়ে দেওয়া হোক। এরপরে সরকার সকল নিয়মকানুন মেনে বোর্ড গঠন করবে, পরিচালনা করবে, আমাদের পূর্ণ সমর্থন থাকবে, এই ব্যাপারে আমাদের কোন আপত্তি থাকবে না। সন্তান তার মায়ের কোলেই তো নিরাপদ, ওরা তো সৎ মা হয়ে এসেছিল। ওদের কোন দরদ ছিল না, ওরা ডাকাতি করেছে। এখন আবার যদি অসৎ লোকদেরকে দিয়ে এই ব্যাংক পরিচালনা করা হয়, যা আছে তাও শেষ হয়ে যাবে, উধাও হয়ে যাবে। আমাদের উদ্বেগটা এই জায়গায়।

বিরোধী দলের নেতা বলেন, তখন যখন এই সমস্যা দেখা দিয়েছিল, মাত্র ৪ দিনে ওখানে ৭০ হাজার কোটি টাকা ব্যাংক থেকে মানুষ উত্তোলন করে ফেলেছিল। আমরা একটি অনুরোধ জানিয়েছিলাম একজন গ্রাহক হিসাবে, ছোট্ট একজন মালিক হিসাবে একটু ধৈর্য ধরুন, ব্যাংকটাকে বাঁচতে দিন। থেমে গিয়েছিল। এখন কী বলব মানুষকে? এখন তো বলার কিছুই খুঁজে পাচ্ছি না। এইজন্য আপনার মাধ্যমে আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে বিশেষভাবে অনুরোধ করব বিষয়টা নিয়ে তিনি যেন সিরিয়াসলি ভাবেন। কোনো পূর্বধারণা থেকে নয়, বাস্তবতার ভিত্তিতেই এই ব্যাংকটাকে বাঁচাতে হবে। আমরা বিশ্বাস করি এই ব্যাংক বাঁচলে, তার আগের জায়গায় ফিরে আসলে ব্যাংকিং ব্যবস্থাপনার ওপরে মানুষের আস্থা আবার ফিরে আসবে।

তিনি আরো বলেন, অর্থনীতির দুই চাকার এক চাকা ব্যাংক, আরেক চাকা স্টক মার্কেট। ব্যাংকে আস্থা ফিরে আসলে অবভিয়াসলি হাত ধরে স্টক মার্কেটেও আস্থা ফিরে আসবে। আমরা আমাদের দেশটাকে সামনে এগিয়ে নিতে যাচ্ছি, এইটাই দেখতে চাই। আর লেইম এক্সকিউজ এবং ব্লেইমের যে বিষয়গুলো এখানে চলে আসে, এটা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় চাই। অলরেডি ৫টা ব্যাংকের গ্রাহকরা রাস্তায় রাস্তায় ভিক্ষুকের মতো ঘুরছে। তারা তাদের বিনিয়োগের কোন রেজাল্ট পাচ্ছে না, তারা তাদের আমানত ফেরত পাচ্ছে না। আবার যদি সর্ববৃহৎ ব্যাংকের একই বিপদ-বিপর্যয় ঘটে, তাহলে আমরা গিয়ে কোথায় দাঁড়াব? আমি আপনার মাধ্যমে একটা প্রতিকার চাই, ব্যাংকটা বাঁচুক, আমরা এইটাই চাই।

ইসলামী ব্যাংক বিএনপি সরকারের হাতেই সবচেয়ে নিরাপদ-অর্থমন্ত্রী

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি-র ভবিষ্যৎ বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) এবং বর্তমান সরকারের হাতেই সবচেয়ে নিরাপদ বলে মন্তব্য করেছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। জাতীয় সংসদে ব্যাংকটির বর্তমান পরিস্থিতি ও পরিচালনা পর্ষদ নিয়ে বিরোধী দলের আনা প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি বলেন, এই ব্যাংকটির গোড়াপত্তন করেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান, তাই এর মর্যাদা ও আর্থিক শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে বর্তমান সরকার সর্বোচ্চ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক গোষ্ঠী ব্যাংকটিকে ব্যর্থ করার যে অপচেষ্টা চালাচ্ছে, তা রুখে দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে মন্ত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন, ইসলামী ব্যাংককে নিয়ে কোনো ধরনের ষড়যন্ত্র বা উচ্ছৃঙ্খলতা সহ্য করা হবে না।

সংসদে বিরোধীদলীয় সদস্যদের বক্তব্যের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ইসলামী ব্যাংক থেকে অর্থ আত্মসাতের যে অভিযোগ তোলা হচ্ছে, তার কোনো ভিত্তি নেই। কোনো কোনো বিরোধী দলীয় নেতা চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে গোল্ড মেডেল দাবি করছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, যারা অর্থ নিয়েছেন তারা তো কেউ নিজের নামে টাকা নেননি। এই পুরো বিতর্কের সূত্রপাত হয়েছে বিগত নির্বাচন থেকে। আমরা দেখেছি, নির্বাচনে কিছু কিছু এলাকায় ক্যান্ডিডেটরা অবিশ্বাস্য রকমের টাকা খরচ করেছেন। এমন অনেক প্রার্থী ছিলেন যাদের দৃশ্যমান কোনো ব্যবসা-বাণিজ্য বা আয়ের উৎস জানা নেই, অথচ তারাও নির্বাচনে ৫০ থেকে ১০০ কোটি টাকা খরচ করেছেন। এই অবৈধ ও অপ্রদর্শিত অর্থ যখন রাজনীতিতে প্রবেশ করে, তখন তা গোটা গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বিরোধী দলের আনা পিটিশনের বরাতে ব্যাংকের চেয়ারম্যানের সমালোচনা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, বিরোধী দল চেয়ারম্যানের চরিত্র নিয়ে যেসব মন্তব্য করেছে তা সম্পূর্ণ তাদের নিজস্ব বিষয়। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক বিষয়টি তদন্ত করে অনিয়মের কোনো প্রমাণ পায়নি।

তিনি প্রশ্ন উত্থাপন করে বলেন, বিশ্বের কোনো ব্যাংকের গ্রাহকই চেয়ারম্যানের নাম দেখে টাকা জমা রাখে না বা উত্তোলন করে না। গ্রাহকের মূল স্বার্থ থাকে তার আমানতের নিরাপত্তা ও সঠিক লভ্যাংশ পাওয়ার ওপর। সুতরাং, চেয়ারম্যান পরিবর্তনের কারণে ইসলামী ব্যাংক থেকে ২-৩ হাজার কোটি টাকা উত্তোলন হয়ে যাওয়ার যে দাবি বিরোধী দল করছে, তা অবান্তর। প্রকৃতপক্ষে ব্যাংকের ভেতরে ও বাইরে একটি উগ্র গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে মিছিল ও বিশৃঙ্খল কর্মসূচি পরিচালনা করছে। এই উশৃঙ্খলতার সঙ্গে বিরোধী দলের আশঙ্কার একটি যোগসূত্র লক্ষ্য করা যাচ্ছে। মূলত কিছু অশুভ শক্তি ইসলামী ব্যাংকটিকে ব্যর্থ করে দিয়ে দেশের সামগ্রিক আর্থিক শৃঙ্খলা নষ্ট করতে চায় এবং এর মাধ্যমে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের অপচেষ্টা চালাচ্ছে।

ইসলামী ব্যাংকের আর্থিক অবস্থার একটি পরিসংখ্যান তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, বিরোধী দল দাবি করছে যে ফ্যাসিবাদ পরবর্তী সময়ে এক বছরের ব্যবধানে ব্যাংকের মুনাফা ১০৮ কোটি টাকা থেকে ১৩৭ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছিল। কিন্তু প্রকৃত চিত্র হলো, এটি ছিল মূলত 'উইন্ডো ড্রেসিং' বা কৃত্রিমভাবে দেখানো মুনাফা। খেলাপি ঋণের বিপরীতে বিশাল অংকের প্রভিশন পরবর্তী বছরের জন্য ডেফারেল বা স্থগিত সুবিধা নিয়ে এই মুনাফা দেখানো হয়েছিল। প্রকৃতপক্ষেক্ষ ২০১৫ সালের (২০২৫ সালের) শেষে ইসলামী ব্যাংকের শ্রেণিকৃত ঋণ ৯৪ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা ব্যাংকের মোট ঋণ পোর্টফোলিওর ৫১ শতাংশ। ২০২৪ সালের ৩১ ডিসেম্বর যেখানে ব্যাংকটি ৬৯ হাজার কোটি টাকার প্রভিশন ডেফারেল সুবিধা নিয়েছিল, সেখানে ২০২৫ সালের ৩১ ডিসেম্বর তা বেড়ে দাঁড়ায় ৮৪ হাজার কোটি টাকায়। এর ফলে ২০২৬ সালের প্রথম দিকে ব্যাংকটি কোনো মুনাফা করতে পারেনি, উল্টো প্রায় ২৬৮ কোটি টাকা নিট লোকসান গুনেছে।

তিনি আরও উল্লেখ করেন, বিগত স্বৈরশাসকের সময় যখন ইসলামী ব্যাংক জোরপূর্বক দখল করা হয়েছিল, তখনও সাধারণ গ্রাহকরা কিন্তু তাদের আমানত তুলে নেননি। সুতরাং এখন চেয়ারম্যান পরিবর্তনের কারণে গ্রাহকরা টাকা তুলে চলে যাচ্ছেন, এই যুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশ ব্যাংক বর্তমানে আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এই ব্যাংকটিকে তার প্রকৃত ও বৈধ মালিকদের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার কাজ করছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সংস্কার কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করার জন্য একটি রাজনৈতিক মহল দেশজুড়ে 'মবোক্রেসি' বা উশৃঙ্খলতার সংস্কৃতি তৈরি করতে চাচ্ছে। যেকোনো অনাকাঙ্খিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে দেশকে অস্থিতিশীল করার যে প্রবণতা, তা রুখে দেওয়া হবে।

বর্তমান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের প্রশংসা করে মন্ত্রী বলেন, দেশের সর্বস্তরের মানুষ এবং বেসরকারি খাত মনে করে দীর্ঘদিন পর একজন যোগ্য গভর্নর দায়িত্ব পেয়েছেন, যিনি নিয়মনীতির মধ্যে থেকে সঠিক সময়ে সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন। তাকে ঋণগ্রস্ত বলে যারা খাটো করার চেষ্টা করছেন, তারা মূলত ভালো কাজকে স্বীকৃতি দিতে চান না। সংসদে উপস্থিত প্রায় সব সদস্যই কোনো না কোনোভাবে গাড়ি, বাড়ি বা ব্যবসার প্রয়োজনে ব্যাংকের কাছে ঋণগ্রস্ত। সুতরাং ঋণ থাকা কোনো অপরাধ নয়।

মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সবসময় আর্থিক শৃঙ্খলায় বিশ্বাসী এবং অতীত সরকারগুলোর আমলেও দেশে সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় ছিল। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান এই ইসলামী ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন, তাই এই ব্যাংকের ভবিষ্যৎ বিএনপির হাতে সম্পূর্ণ নিরাপদ। দেশের ভঙ্গুর অর্থনীতিকে পুনর্গঠন করে সমৃদ্ধির পথে নিয়ে যেতে ফিন্যান্সিয়াল সেক্টরের গুরুত্ব সরকার অক্ষরে অক্ষরে বোঝে। দেশের মানুষকে হতাশ করে এমন কোনো অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি না করতে বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, দেশের উন্নয়ন ও আগামী বাংলাদেশ গড়ার শপথ থেকে নির্বাচিত বিরোধী দলকে বাদ দেওয়া হচ্ছে না। সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশের স্বার্থে কাজ করার এবং তুচ্ছ ইস্যু নিয়ে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানান তিনি।

ইসলামী ব্যাংককে ইসলামিক কায়দায় সৎ লোকদেরকে দিয়েই পরিচালিত করার জন্য চেষ্টা করতে হবে

আব্দুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ইসলামী ব্যাংক যারা প্রতিষ্ঠা করেছিল, তারা এ দেশের অত্যন্ত সম্মানীয় এবং অত্যন্ত যোগ্যতা সম্পন্ন ব্যক্তিরা ছিল। এবং ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশে শুরুর পিছনে যিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন এবং সহযোগিতা করেছিলেন, অনুমোদন দিয়েছিলেন এটা আমার সামনে যারা বসে আছেন, বিএনপি... বিএনপির যিনি প্রতিষ্ঠাতা, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, এটা উনারা জানেন কিনা আমি জানি না। উনার উৎসাহে, অনুমোদনেই এ দেশে প্রথম ইসলামী ব্যাংক এখানে প্রতিষ্ঠিত হয়।

তিনি বলেন, ইসলামী ব্যাংক একটি আন্তর্জাতিক ইনভেস্টমেন্টের মাধ্যমেই এখানে তৈরি হয়েছিল, আপনারা জানেন। এখানে আইডিবি'র ফান্ডিং ছিল, কুয়েত ফাইন্যান্স ব্যাংকের ফান্ডিং ছিল, আল রাজি যেটা বিশাল কোম্পানি আল রাজিÑসেখানে ফান্ডিং ছিল। এবং বাংলাদেশের কতিপয় ইসলামপ্রিয় মানুষের ফান্ডিং ছিল। ইসলামী ব্যাংক পরিপূর্ণভাবে একটি যোগ্য এবং সততার ভিত্তিতে পরিচালিত হয়েছে। আজকেও ইসলামী ব্যাংকের যারা স্টাফ আছেন, চাকরি করছেন, এদের কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে এমন কোনো অবস্থান সেখানে ছিল না। ইট ওয়াজ ফুল্লি একটা নিরপেক্ষ, স্পিরিচুয়াল স্পিরিট এবং সততার ভিত্তিতে এফিশিয়েন্টলি এই ব্যাংক পরিচালিত হয়। সে কারণেই এশিয়াতে ১১ বারের মতোই এই ব্যাংকটি প্রধান প্রাইভেট সেক্টরের প্রধান ব্যাংক হিসেবে আবির্ভূত হয়। এবং যেটা বলেছে, সবচেয়ে গণমুখী ব্যাংক ছিল ইসলামী ব্যাংক। ৩ কোটি গ্রাহক আমার ধারণা, আমি জানি না এক্স্যাক্টলি এই পরিমাণ গ্রাহক আর কোনো ব্যাংকে আছে বলে আমি মনে করি না।

তিনি আরো বলেন, স্বৈরাচার যখন ক্ষমতায় আসলো, তারা এই ব্যাংকটাকে লুটপাট করার জন্যই তারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এস আলমের মতো ব্যাংক লুটের বিশ্ব ডাকাত, আনফরচুনেটলি এই ব্যাংকের কর্ণধার হিসেবে তৎকালীন স্বৈরাচার শাসক তাকে সেইখানে বসিয়েছিল। আপনারা দেখেছেন, যে রিপোর্টটা ইসলামী ব্যাংক একটা তদন্ত কমিটি করেছিল, সেই তদন্ত কমিটিতে যে রিপোর্ট এখন ব্যাংকে আছে ব্যাংকের কর্তারা জানেন যে ২৬টার মতো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ভুয়া প্রতিষ্ঠান তৈরি করে তাদের নামে এই ব্যাংক লোনটা নিয়ে যাওয়া হয়েছিল। এই ভুয়া কোম্পানিগুলির ২৬ জন যারা আছে, তাদের মধ্যে আপনার এস আলমের বাসার চাকর, তার চাকরানি, তার পিওন, তার কর্মচারী এ ধরনের বহু লোককে দিয়েই একেবারে ভুয়া কোম্পানি গঠন করে আপনার ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকা এই ইসলামী ব্যাংক থেকে সরিয়ে নিয়েছিল। এই অভ্যুত্থানের পরে আবার নতুন করে এই ব্যাংক কিছুটা প্রাণ ফিরে পায়।

তিনি বলেন, আমরা আশা করেছিলাম যে এই সরকার এসে সর্বপ্রথম বিদেশে যে টাকাগুলো আছে, এস আলম নিয়ে চলে গিয়েছিল, সেগুলোকে ফেরত আনানোর জন্যই উদ্যোগ গ্রহণ করবে। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করছি, সেই দিকে না গিয়ে গভমেন্ট বিতর্কিত লোকদেরকে সেখানে বসিয়ে এখন যে পরিমাণ কিছু টাকা আছে, জনগণের টাকা, সে টাকাকেও কীভাবে লুটপাট করা যায়, সেরকম উদ্যোগ গ্রহণ করছে। যে ব্যক্তিটিকে এখন চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছে, তার ব্যক্তিগত চরিত্র, তারপরে টাকা আত্মসাৎ, ঘুষ খাওয়া এ ব্যাপারে ইতিমধ্যেই বহু রিপোর্ট আমরা এখানে দেখতে পাচ্ছি। এরকম একটি লোককে ইসলামী ব্যাংকের, যেখানে সততাই অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল, এফিশিয়েন্সি অন্যতম প্রধান ছিল, সেই সৎ ব্যাংকটির চেয়ারম্যান বানানো হয়েছে একজন প্রমাণিত অর্থ আত্মসাৎকারী এবং দুর্নীতিবাজ ব্যক্তিকে। এরকম লোকেরা যদি এখানে চেয়ারম্যান হয়, তাহলে এস আলমের মতোই তারা বাকি টাকাগুলোকেও, জনগণের টাকাকে নিয়ে যাবে এটা অত্যন্ত পরিষ্কার। এবং এই জন্যই ইসলামী ব্যাংকের গ্রাহকদের ভিতরে এক বিরাট আতঙ্ক তৈরি হয়েছে।

বিরোধী দলের উপনেতা বলেন, আজকে ইসলামী ব্যাংকের যে টাকা, এ টাকাগুলো কাদের? এখানকার সৎ মানুষের এবং যারা ইসলামিক অর্থনীতিতে বিশ্বাস করে, এটা তাদের টাকা। সুতরাং এই টাকার ব্যাপারে আমাদের অবশ্যই কনসার্ন আছে। সেখানে আমি একজন গ্রাহক, আমি একজন ডিপোজিটর আছি সেখানে। এবং এখানে যারা আছে তারা এবং ওই সাইডের অনেকেই আছেন নিশ্চয়ই, যারা ইসলামী ব্যাংকের সাথে ব্যবসা করছেন এবং তারা কমফোর্টেবলি ব্যবসা করতে চাচ্ছেন। এখন একটি সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত কী? একটি সরকারের লক্ষ্য হওয়া উচিত যে এ সমস্ত প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে অধিকতর সুন্দর এবং সুষ্ঠুভাবে পরিচালিত হয়, সেজন্য চেষ্টা গ্রহণ করা। কিন্তু আমরা দেখছি, এই সরকার আসার পরে যে পরিবর্তনটা ব্যাংকে নিয়ে আসা হচ্ছে, এটা একেবারেই একটি নেগেটিভ অ্যাটিটিউড আমরা দেখছি এবং অন্যায়কারী, অসৎ লোকদেরকে দেওয়া হয়েছে। আমরা এটা জানতে চাই যে ওবায়েদুর রহমান সাহেবকে চেয়ারম্যান করার পরে, ওমর ফারুক যে এটার এমডি ছিল, এই দুইজনের নেতৃত্বে ব্যাংকটি আবার কিছুটা হলেও স্বাভাবিকতা ফিরে পাচ্ছিল। কোন কারণে আজকে চেয়ারম্যানকে চেঞ্জ করা হলো? কোন কারণে এমডিকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হলো? এটা এই জাতির কাছে পরিষ্কার থাকা উচিত।

তিনি বলেন, আমি এটা পরিষ্কার করে বলতে চাই যে এই ইসলামী ব্যাংক এর আগে যেভাবে ছিল, ওবায়েদুর রহমান এবং এমডি ওমর ফারুক, এদেরকে সেখানে রিহ্যাবিলিটেট করে আগের পর্যায়ে রেখে, তাদেরকে যে রিজাইন করতে বাধ্য করা হয়েছে সেটাকে আবার উইথড্র করে, ইসলামী ব্যাংকে স্বাভাবিকভাবে চলার জন্য সেই সুযোগ করে দেওয়া দরকার। আর যদি সেটা না হয়, তাহলে গ্রাহকের টাকা রক্ষার জন্য গ্রাহকরা কিন্তু আন্দোলন করবে। তিনি আরো বলেন, আমার সাজেশন হচ্ছে খুব সহজ। আমরা দেখছি যে ইসলামী ব্যাংকে আওয়ামী লীগ যেভাবে দখল করেছে আমাদের মাননীয় মন্ত্রী সালাউদ্দিন সাহেব তার আগের বক্তৃতায় বলেছিলেন যে এটা কত অংশ শেয়ার... মানে শেয়ারহোল্ডার কত অংশের মালিক আছে। না, ৮২ পার্সেন্ট এস আলমের যে মালিকানা, এই ৮২ পার্সেন্টই হচ্ছে অন্যান্য লোকদের মালিকানাকে ডাকাতির মাধ্যমে, ডিজিএফআই দিয়ে এটাকে সে দখল করে জোর করে নিয়ে গেছে। আমাদের দাবি, এটা অরিজিনাল মালিকদের ফেরত দিতে হবে এবং যেভাবে সুষ্ঠুভাবে চলছিল সেটাকে অব্যাহত রাখার জন্য চেষ্টা করতে হবে। না হলে গ্রাহকরা আন্দোলন করবে, ইসলামী ব্যাংকের পক্ষেক্ষ যারা আছে তারা আন্দোলন করবে এবং দেশে একটা বড় ধরনের আনরেস্ট হওয়ারও সম্ভাবনা আছে। আমি সেজন্য অনুরোধ করব যে আগের মতো করে ইসলামী ব্যাংককে ইসলামিক কায়দায় সৎ লোকদেরকে দিয়েই পরিচালিত করার জন্য চেষ্টা করতে হবে। এবং এস আলমের লোককে বসানোর জন্য চেষ্টা করছে; কোনো এস আলমের লোক ইসলামী ব্যাংকের কাছকাছিও যেতে পারবে না।

নতুন চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে এখনো কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি-স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, একবার যে ব্যাংক আজান দিয়ে, তাকবির দিয়ে দখল করা হলো, সেই ব্যাংকের দখলটা বেদখল হয়ে গেলে যে কী যাতনা, তা আমরা বুঝি। এখন পর্দার আড়ালে থেকে গ্রাহক সাজিয়ে রাস্তায় আন্দোলন করানো হচ্ছে।

ব্যাংকটির পল্লী উন্নয়ন প্রকল্পের (আরডিএস) তীব্র সমালোচনা করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এটি নারী গ্রাহক নির্ভর একটি প্রকল্প। ভোটের আগে এই প্রকল্প থেকে নারীদের ১০ হাজার টাকা করে দিয়ে বলা হয়েছেÑ কুরআনের দলে ভোট না দিলে জান্নাতে যাওয়া যাবে না, ভোট দিলে জান্নাত মিলবে এবং আরও ১০ হাজার টাকা পাওয়া যাবে। এই আরডিএস প্রকল্পে মোট ২২ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে, যার মধ্যে ৫ আগস্ট (২০২৪) পরবর্তী সময়ে নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়ার জন্য ১১ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে, যার কোনো হদিস নেই।

রাজনৈতিক বিবেচনায় ঋণ দেওয়ার অভিযোগ তুলে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, নাবিল গ্রুপকে এলসির বিপরীতে ৭০০ কোটি টাকা লোন দেওয়া হয়েছে। দুষ্টু লোকেরা বলে সেই টাকা একটি দলের নির্বাচনী তহবিলে গেছে এবং একটি টিভি চ্যানেল খোলা হয়েছে। লান্তাবুর গ্রুপকে হেড অফিসের অনুমোদন ছাড়া নির্বাচনের আগে ৪০ কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। সিএসআর ফান্ডের টাকা দিয়ে ঢাকা থেকে কক্সবাজারের বিমানের টিকিট কাটা হয়েছে। এগুলোর সবকিছুর তদন্ত হবে।

ইসলামী ব্যাংকে গণহারে চাকরিচ্যুতি ও রাজনৈতিক নিয়োগের পরিসংখ্যান তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ব্যাংকটি দখল করার পর কোনো আইন-কানুন না মেনে অন্যায়ভাবে ৯ হাজার কর্মীকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। বিপরীতে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক বিবেচনায় ৬ হাজার নতুন নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ১৩ হাজার জনকে নিয়মবহির্ভূতভাবে দুই-তিনটি করে প্রমোশন দেওয়া হয়েছে। এসব অনিয়ম ইসলামের নামেই হয়েছে। অন্যায়ভাবে যাদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে, তাদের চাকরি ফিরিয়ে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

ব্যাংকটির নবনিযুক্ত চেয়ারম্যানের পক্ষে অবস্থান নিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, নতুন চেয়ারম্যানের বিরুদ্ধে এখনো কোনো অভিযোগ প্রমাণিত হয়নি। ‘প্রিজাম্পশন অব ইনোসেন্স’ নীতি অনুসারে তিনি বেনিফিট পাবেন। যদি সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আসে, তবে নিশ্চয়ই তদন্ত হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ব্যাংক কোম্পানি আইনের ৪৫, ৪৬, ৪৭ ও ৫৭ ধারার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষায় পর্ষদ বাতিল বা নতুন চেয়ারম্যান নিয়োগ দেওয়ার পূর্ণ এখতিয়ার কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রয়েছে।

বিরোধীদের শেয়ার ফেরত দেওয়ার দাবির জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ইবনে সিনা ব্লক মার্কেটে তিনগুণ দামে শেয়ার বিক্রি করেছে, যা একটি রেকর্ড। তবে যারা বৈধ এবং প্রকৃত শেয়ারহোল্ডার, তদন্ত সাপেক্ষে তাদের মালিকানা ফেরত দেওয়ার যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। সেই সঙ্গে এস আলম গ্রুপের লাখো কোটি টাকা পাচারসহ বিগত সময়ে দেশের যত টাকা পাচার হয়েছে, সবকিছুর সুষ্ঠু তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে সংসদকে আশ্বস্ত করেন তিনি।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এখন বলা হচ্ছে আপনারা ব্যাংকের মালিক না। জামায়াতে ইসলাম ব্যাংকের মালিক না। আবার বলছে ইসলামের ওপরে হাত দেবেন না। ইসলামী ব্যাংক ইসলাম নয়। আমাদের মির্জা ফখরুল ইসলামও ইসলাম নয়। জামায়াতে ইসলামীও ইসলাম নয়। সুতরাং সবকিছুতেই ইসলামের ওপরে হাত দেবেন না দোহাই দেওয়া কিন্তু ঠিক নয়।

তিনি আরও বলেন, এখানে আরডিএস নামে একটা প্রকল্প আছে। সেই প্রকল্প হচ্ছে ইসলামী ব্যাংকের একটা ফ্ল্যাগশিপ প্রকল্প। এই প্রকল্পের মূল হচ্ছে পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প নামে। যেখানে ৫ হাজার, ১০ হাজার, ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত লোন দেওয়া যায়। নারী গ্রাহকের সংখ্যাই বেশি। ভোটের আগে ১০ হাজার টাকা করে অনেক নারীকে দেওয়া হয়েছে। লাইনে এক ভোটারকে আমার এক কর্মী জিজ্ঞেস করেন মা আপনি কোথায় ভোট দেবেন- বলছে বাবা, কোরআনের দলে না দিলে তো জান্নাতে যাওয়া যাবে না। ১০ হাজার টাকাও দিয়েছে, বলেছে এটা মাফ হয়ে যাবে, আরও ১০ হাজার টাকা পাবো। মুনাফা হিসাবে দাঁড়িপাল্লায় ভোট দিলে জান্নাত পাওয়ার নিশ্চয়তাও দিয়েছে। এই আরডিএস প্রকল্পের মধ্যে কত হাজার কোটি টাকা ডিস্ট্রিবিউট হয়েছে জানেন- ২২ হাজার কোটি টাকা। ১১ হাজার কোটি টাকা আগে দেওয়া হয়েছিল। ৫ আগস্ট ২০২৪ এর পরে নির্বাচনের বৈতরণী পার হওয়ার জন্য আরও ১১ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে, এর কোনো হদিস নেই। একজন নারী ভোটারের কথা তো বললাম।

তিনি আরও বলেন, আজকে ইন্টারেস্টিংলি দেখছি আমাদের এনসিপির বন্ধুরা কেউ নেই। আপনারা জামায়াতে ইসলামীকে কী বয়কট করলেন কিনা জানি না, কেউ বক্তব্যও দেয়নি, আমি চেয়ারগুলো খালি দেখে বলতেছি।

পরে এনসিপির সংসদ সদস্য আপত্তি জানালে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এ বক্তব্য এক্সপাঞ্জ করা হয়।

সাইফুল আলম খান মিলন বলেন, ব্যাংক কোম্পানি আইনসহ বিভিন্ন আইনের প্রয়োজনীয় বৈপ্লবিক সংশোধন, সুশাসনের জন্য সুপারিশমালা, আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সংস্থার প্রস্তাবসহ এবং তথ্য তথ্যের অবাধ প্রবাহ ও গণমাধ্যমের প্রকাশাধিকার নিশ্চিত করা, ভালো গ্রাহকদের প্রণোদনা দেওয়া, প্রকৃত চিত্র এবং কৃত্রিম উইন্ডো ড্রেসিং বন্ধ করা।

তিনি বলেন, আজকে শুধু ইসলামী ব্যাংক নয়, সরকারি খাতের ব্যাংকগুলো উইন্ডো ড্রেসিং করে এরপর বলা হচ্ছে পর্ষদদেরকে সরাসরি দায়বদ্ধতা করা। যখন ঋণ স্যাংশন হয় তখন অফিসারদের ধরা হয় কিন্তু ডাইরেক্টরদের ধরা হয় না। ডাইরেক্টরদের ধরা হইলে তারা এরকম উল্টাপাল্টা ঋণ দিবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের স্বায়ত্তশাসন থাকা দরকার। কেন্দ্রীয় ব্যাংক আজকে স্বায়ত্তশাসন নেই। অ্যাসেস ম্যানেজমেন্ট কোম্পানি থাকা বিশ্বব্যাংকের পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত ও বিচার ট্রাইবুনাল করার আর কি। আরেকটি কথা বলে আমি শেষ করছি। আজকে বলা হয় যে ইসলামী ব্যাংককে রাজনৈতিক রাজনীতি মুক্ত করতে হবে। এটা বিশেষ রাজনৈতিক দলের হাতে কেন থাকবে? আমাদের মাননীয় সংসদ সদস্য এবং মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু সাহেবের একটি ব্যাংকের কর্ণধার। আমরা কি বলবো সেটা বিএনপির ব্যাংক? আমরা কি ঢাকা ব্যাংকে বলব? মির্জা আব্বাস সেখানে ডাইরেক্টর, সেটাকে কি আমরা বলবো আপনার বিএনপির ব্যাংক? অথবা আমাদের আবদুল জলিল সাহেব যে ব্যাংকের ডাইরেক্টর ছিল সেটাকে আওয়ামী লীগের ব্যাংক বলবো?