নৈতিক ও অর্থনৈতিক অস্থিরতা, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি, সীমান্তে ভারত কর্তৃক অবৈধ পুশইন ও বাংলাদেশি নাগরিকদের হত্যা এবং সার্বভৌমত্বকে ক্ষুণ্ন করার অপপ্রয়াস, প্রবাসী বাংলাদেশিদের নানা সমস্যা এবং বিশ্বের বিভিন্ন দেশে চলমান সংঘাতময় পরিস্থিতি গভীর উদ্বেগের সাথে পর্যালোচনা করে জনগণের প্রত্যাশা পূরণ, রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণ এবং ন্যায়ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা সর্বসম্মতিক্রমে ৭ দফা প্রস্তাবনা গ্রহণ করেছে।
২৬ জুন ২০২৬, শুক্রবার রাজধানীর আল-ফালাহ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত দলের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরার অধিবেশনে সর্বসম্মতিক্রমে এই প্রস্তাবসমূহ গৃহীত হয়।
১। অবিলম্বে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন: সকল রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রণীত ও স্বাক্ষরিত জুলাই জাতীয় সনদ এবং চলতি বছরের ১২ ফেব্রুয়ারির গণভোটে সংবিধান সংস্কারের লক্ষ্যে ‘হ্যাঁ’ -এর পক্ষে দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের গণরায় একটি বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ বিনির্মাণের মৌলিক রূপরেখা। কিন্তু গণভোটের রায় সরকার কর্তৃক অসম্মান ও অগ্রাহ্য করায় জনগণের মধ্যে চরম হতাশা, ক্ষোভ বিরাজ করছে এবং সরকারের প্রতি অনাস্থা সৃষ্টি হয়েছে, যা রাষ্ট্রের জন্য একটি অশুভ সংকেত।
এ প্রেক্ষিতে জামায়াতের কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা জোরালোভাবে প্রস্তাব করছে যে,
ক) গণভোটের গণরায় অবিলম্বে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠন করতে হবে। যার মাধ্যমে জনগণের আকাঙক্ষার প্রতিফলনের পথ প্রশস্ত হবে।
খ) চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে এমন সকল রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও অংশীজনদের সম্পৃক্ত করে জাতীয় ঐকমত্য বজায় রাখতে পদক্ষেপ নিতে হবে।
২। দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও সিন্ডিকেট ভাঙতে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ: দ্রব্যমূল্যের ক্রমবৃদ্ধির ফলে দেশের প্রান্তিক শ্রেণি থেকে শুরু করে নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ নিত্যপণ্য ক্রয়ের সক্ষমতা হারিয়ে ফেলেছে। ফলে নাগরিকদের ভোগান্তি বেড়েছে।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে জামায়াতের মজলিসে শূরা প্রস্তাব করছে যে,
ক) নাগরিকদের ক্রয় ক্ষমতা বিবেচনায় দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ ও বাজার সিন্ডিকেট ভাঙতে সরকারকে নিয়মিত বাজার মনিটরিং, ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম পরিচালনা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত তদারকি জোরদার করতে হবে।
খ) ভর্তুকি ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে দরিদ্র ও নিম্নআয়ের জনগোষ্ঠীকে সহায়তা প্রদান করতে হবে।
গ) দেশের উৎপাদন খাতকে নিরাপদ ও সাশ্রয়ী রাখতে নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে উৎপাদন থেকে ভোক্তা পর্যন্ত কোনো ভোগান্তি না হয়।
ঘ) জ্বালানি খাতের স্থিতিশীলতার জন্য দেশীয় উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে টাস্কফোর্স গঠন করতে হবে।
৩। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি; চাঁদাবাজি, হত্যাকাণ্ড ও দখলবাজি বন্ধ এবং সন্ত্রাস নির্মূলে জিরো টলারেন্স নীতি অবলম্বন: আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতিতে দেশব্যাপী হত্যাকাণ্ড, ধর্ষণ, চাঁদাবাজি, দখলবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের বিস্তার ও জননিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। পাশাপাশি ব্যবসা-বাণিজ্য এবং দেশি ও বিদেশি (এফডিআই) বিনিয়োগের পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। এ পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও সামাজিক স্থিতিশীলতা ব্যাহত হবে। এছাড়াও বাংলাদেশের সীমান্তে অস্থিরতার জন্য প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারত অশুভ পরিকল্পনা অব্যাহত রেখেছে। যার কারণে সাম্প্রতিক সময়ে পুশইন চেষ্টা, আন্তর্জাতিক সীমান্ত আইনকে বৃদ্ধাঙ্গলি দেখিয়ে বাংলাদেশি নাগরিকদের অন্যায়ভাবে গুলি করে হত্যা করছে ভারতীয় বাহিনী বিএসএফ।
এ প্রেক্ষিতে জামায়াতের মজলিসে শূরা প্রস্তাব করছে যে,
ক) অপরাধীদের দলীয় পরিচয় বা প্রভাব বিবেচনা না করে তাদের দ্রুততম সময়ের মধ্যে গ্রেফতার করে বিচারের আওতায় আনতে হবে এবং শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
খ) আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নকল্পে অবশ্যই অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করতে হবে।
খ) আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে তাদের পেশাদারিত্ব, দক্ষতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। নিম্ন আদালত ও উচ্চ আদালতের বিচার ব্যবস্থাকে নিরপেক্ষ, দ্রুত, কার্যকর ও সময়োপযোগী করতে হবে।
গ) দেশে ধর্ষণ রোধ ও ধর্ষকদের শাস্তি নিশ্চিতে সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে আইনের প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সমাজের সর্বস্তরের জনগণকে সচেতন করে সামাজিক প্রতিরোধ আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
ঘ) ভারত কর্তৃক অবৈধ পুশইন ঠেকাতে সরকারের দৃঢ় ও কঠোর অবস্থান গ্রহণ করে বিজিবিকে সক্রিয় রাখা। একই সঙ্গে সীমান্তবর্তী নাগরিকদের সতর্ক রাখতে স্থানীয় সরকার ও প্রশাসনের মাধ্যমে ব্যবস্থা নিতে হবে।
ঙ) সীমান্ত হত্যা বন্ধে ও পুশইন ঠেকাতে কূটনৈতিক চ্যানেলে তীব্র প্রতিবাদ জানানো ও আলোচনায় মাধ্যমে সীমান্তের যেকোনো সমস্যা সমাধানের পন্থা নিশ্চিত করতে হবে। এজন্য আন্তর্জাতিক লবি, মানবাধিকার সংগঠনগুলোকে কাজে লাগাতে হবে।
চ) ভারতের পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে কূটনৈতিক চ্যানেলে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে।
ছ) সরকারকে ভারতীয় হাইকশিনারের বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব ও অখন্ডতা বিরোধী বক্তব্যের প্রতিবাদ করতে হবে।
৪। স্থানীয় সরকার নির্বাচন দ্রুত অনুষ্ঠান: গণতন্ত্রকে অর্থবহ করতে ও রাষ্ট্রের সেবা জনগণের দোরগোড়ায় পৌঁছে দেয়ার জন্য স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা, শৃঙ্খলা এবং জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় দ্রুত নির্বাচনের বিকল্প নেই।
এমতাবস্থায় জামায়াতের মজলিসে শূরা প্রস্তাব করছে যে,
স্থানীয় পর্যায়ের সকল স্তরে দ্রুত নির্বাচন দেয়ার লক্ষ্যে সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদে প্রশাসক হিসেবে নিয়োগ পাওয়া সরকার দলীয় নেতাদের অতি দ্রুত অপসারণ করতে হবে।
৫। রাষ্ট্রীয় ও প্রশাসনিক কাঠামোতে দলীয়করণমুক্ত ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা: রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানসমূহে দলীয়করণ, পক্ষপাতিত্ব ও রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের ফলে সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা ব্যাহত হচ্ছে।
এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে জামায়াতের মজলিসে শূরা প্রস্তাব করছে যে,
ক) প্রশাসন, বিচার বিভাগ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সকল ধরনের দলীয় ও রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রেখে সংবিধান ও প্রচলিত আইন অনুযায়ী স্বাধীন, নিরপেক্ষ ও পেশাদারিত্বের ভিত্তিতে পরিচালনা নিশ্চিত করতে হবে।
খ) রাষ্ট্রের সকল পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীর নিয়োগ, পদোন্নতি, পদায়ন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে মেধা, যোগ্যতা, দক্ষতা, সততা এবং কর্মদক্ষতাকে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে, যাতে জনগণ দক্ষ, নিরপেক্ষ ও মানসম্মত সেবা লাভ করতে পারে।
গ) নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও জনআস্থা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে একটি শক্তিশালী, স্বাধীন, জবাবদিহিমূলক ও কার্যকর পাবলিক সার্ভিস কমিশনের মাধ্যমে সকল নিয়োগ কার্যক্রম পরিচালনার ব্যবস্থা করতে হবে।
৬। বেসরকারি স্কুল ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের বেতন-ভাতা এবং অবসর সুবিধা নিশ্চিতকরণ:
জামায়াতের মজলিসে শূরা নিম্নোক্ত প্রস্তাবসমূহ পেশ করছে-
ক) বেসরকারি স্কুল ও মাদ্রাসার শিক্ষকদের বেতন-ভাতা সময়োপযোগী করতে হবে এবং মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তা পুনর্নির্ধারণ ও নিয়মিত পরিশোধ নিশ্চিত করতে হবে।
খ) অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষকগণের অবসরকালীন ভাতা ও অন্যান্য প্রাপ্য সুবিধা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রদানের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে, যাতে তাঁরা আর্থিক অনিশ্চয়তা ও দুর্ভোগ থেকে মুক্ত থাকতে পারেন।
৭। জুলাই গণহত্যাকারীদের বিচার দ্রুত সম্পন্নকরণ: বর্তমান সরকারের সময়ে পতিত ফ্যাসিবাদী শাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও সহযোগীদের বিরুদ্ধে চলমান বিচার কার্যক্রমে ধীরগতি পরিলক্ষিত হচ্ছে। একই সঙ্গে অভিযুক্তদের মধ্যে অনেকের জামিনে মুক্তি জনমনে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। এতে নির্যাতিত ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের ন্যায়বিচার প্রাপ্তি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
এ প্রেক্ষাপটে জামায়াতের মজলিসে শূরা প্রস্তাব করছে-
ক) ফ্যাসিবাদী শাসনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও তাদের সহযোগীদের বিরুদ্ধে চলমান বিচার কার্যক্রম দ্রুত, স্বচ্ছ, নিরপেক্ষ ও আইনসম্মতভাবে সম্পন্ন করে দেশে ন্যায়বিচার, আইনের শাসন এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় মজলিসে শূরা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, দেশ ও জনগণের স্বার্থে এই ৭ দফা প্রস্তাবনা আন্তরিকতার সাথে বাস্তবায়ন করা হলে দেশে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও সুশাসন সুদৃঢ় হবে। দলের পক্ষ থেকে এই রূপরেখা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সকল রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ, নীতিনির্ধারক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানানো হয়েছে।