বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেছেন, পলাশী আমাদের ইতিহাসের সাথে অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত এবং এটি আমাদের পরিচয়ের একটি অন্যতম অনুষঙ্গ। ১৭৫৭ সালের এই দিনে ভাগীরথী নদীর তীরে পলাশীর আম্রকাননে নবাব সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের মধ্য দিয়ে আমাদের স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। পলাশী মানেই কিন্তু সেই ভাগীরথী নদীর তীরের সেই পলাশী নয়। এখনও পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, বুড়িগঙ্গার তীরেও কিন্তু সেই পলাশীর চক্রান্ত আছে। নামের মীর জাফর হয়ত নেই, কিন্তু আমাদের এই প্রিয় জন্মভূমি বাংলাদেশের চরিত্রে অসংখ্য মীর জাফর এই ভূখণ্ডে বসবাস করছে।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুর আড়াইটায় জাতীয় প্রেসক্লাবের কাজী নজরুল ইসলাম মিলনায়তনে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের উদ্যোগে আয়োজিত ‘পলাশী দিবসের তাৎপর্য ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক বিশেষ আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, পলাশীর ট্র্যাজেডির মূল কারণ ছিল অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকতা। তিনি বলেন, বাইরের শত্রুর চেয়ে ঘরের শত্রুই বেশি ভয়ংকর, আর ক্ষমতার লোভে দেশ ও জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার ইতিহাসই পলাশীর ইতিহাস। তাঁর মতে, ১৭৫৭ সালের বিপর্যয় স্বাধীনতার আকাক্সক্ষাকে নিঃশেষ করেনি; বরং সেখান থেকেই নতুন স্বাধীনতা সংগ্রামের সূচনা হয়, যা ১৯৪৭ এবং ১৯৭১ সালের মধ্য দিয়ে বিকশিত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, আধুনিক যুগে আধিপত্যবাদ সরাসরি ভূখণ্ড দখলের মাধ্যমে নয়; বরং অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে প্রভাব বিস্তার করে। তাই কেবল ভূখণ্ডগত স্বাধীনতা নয়, বরং প্রকৃত স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষাই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি দাবি করেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণ স্বাধীনতা ও জাতীয় স্বার্থ রক্ষার নতুন প্রত্যয় ব্যক্ত করেছিল। তবে পরবর্তী সময়ে জনগণের সেই আকাক্সক্ষাকে নস্যাৎ করার চেষ্টা চলছে বলে তিনি অভিযোগ করেন। তিনি বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন ধারার নেতাদের সমালোচনা করে বলেন, ১৯৪৭ সালের রাষ্ট্রিক বাস্তবতাকে অস্বীকার বা প্রশ্নবিদ্ধ করার মাধ্যমে জাতিসত্তা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া হচ্ছে।
সভাপতির বক্তব্যে ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম বলেন, পলাশী দিবসের আলোচনার সাথে জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশের গভীর ঐতিহাসিক সম্পর্ক রয়েছে। “পলাশী দিবসের তাৎপর্য ও জুলাই গণঅভ্যুত্থান পরবর্তী বাংলাদেশ” শীর্ষক আলোচ্য বিষয়ের প্রাসঙ্গিকতা তুলে ধরে তিনি বলেন, ইতিহাস বারবার নিজেকে পুনরাবৃত্তি করে (History repeats itself) এবং বিভিন্ন সময়ে ঘষেটি বেগম, উমিচাঁদ ও রায়দুর্লভদের মতো চরিত্রের পুনরাবির্ভাব ঘটে, যারা ভেতর থেকে জাতিকে দুর্বল করে বিদেশি বা আধিপত্যবাদী শক্তির স্বার্থ রক্ষা করে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বারবার “মীরজাফরীয় চরিত্রের” পুনরাবৃত্তি ঘটেছে, যারা দেশের ভেতর থেকেই জন্ম নিয়ে জনগণের স্বার্থের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে এবং বহিঃশক্তির স্বার্থ রক্ষায় ভূমিকা রেখেছে। তিনি বলেন, পলাশীর ট্র্যাজেডি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি একটি ধারাবাহিক ঐতিহাসিক বাস্তবতার প্রতিফলন, যেখানে ভেতরের বিভাজন, স্বার্থান্বেষী রাজনীতি এবং ক্ষমতার লোভ জাতির পরাজয়ের পথ তৈরি করেছে। তিনি ১৭৭০ সালের মন্বন্তরের প্রসঙ্গ তুলে দাবি করেন, ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থার কারণে বাংলার জনগণ ভয়াবহ মানবসৃষ্ট দুর্ভিক্ষের শিকার হয়েছিল, যা শাসনব্যবস্থার নিষ্ঠুরতারই প্রমাণ।
তিনি আরও বলেন, ইতিহাসের সেই ধারাবাহিকতা আধুনিক সময়েও বিভিন্ন রূপে বিদ্যমান, যেখানে রাষ্ট্রীয় রাজনীতি ও ক্ষমতার কাঠামোতে দেশীয় স্বার্থের চেয়ে ভিন্ন শক্তির প্রভাবকে অগ্রাধিকার দেওয়ার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। তাঁর ভাষায়, সূর্যাস্ত আইন ও চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের মতো নীতির মাধ্যমে যেভাবে একটি শোষণমূলক কাঠামো প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল, তারই প্রতিচ্ছবি বিভিন্ন সময়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে পরিলক্ষিত হয়। নূরুল ইসলাম বলেন, এদেশের সার্বভৌমত্ব কেবল বক্তব্য বা স্লোগানের বিষয় নয়; বরং এটি অর্থনীতি, রাজনীতি, সংস্কৃতি ও সমাজব্যবস্থায় গভীর দেশপ্রেম ও আত্মত্যাগের চেতনার মাধ্যমে রক্ষা করতে হয়। তিনি সংগঠনের অবস্থান তুলে ধরে বলেন, ছাত্রশিবির একটি সৎ, দক্ষ ও দেশপ্রেমিক প্রজন্ম গঠনের মাধ্যমে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ বিনির্মাণে কাজ করছে, যারা জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় সচেতন ও দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখবে।
বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সেক্রেটারি জেনারেল সিবগাতুল্লাহর সঞ্চালনায় এই সভায় অতিথি ও আলোচক হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি সালাহউদ্দিন আইউবী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ বিলাল হোসাইন এবং বিশিষ্ট লেখক ও গবেষক ড. সায়ীদ ওয়াকিল।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে আরও উপস্থিত ছিলেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক আজিজুর রহমান আজাদ, সাহিত্য সম্পাদক সাইদুল ইসলাম, প্রকাশনা সম্পাদক আমিরুল ইসলাম, শিল্প ও সংস্কৃতি সম্পাদক আবু মুসা, বায়তুলমাল সম্পাদক আনিসুর রহমানসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।