রাষ্ট্রের চতুর্থ স্তম্ভ হিসেবে পরিচিত সাংবাদিকতা বর্তমানে নানা সংকটের মুখে রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি)-এর মহাপরিচালক ফারুক ওয়াসিফ। তিনি বলেন, সাংবাদিকতা যদি তার হারানো মর্যাদা, সততা ও জনআস্থা পুনরুদ্ধার করতে না পারে, তাহলে ভবিষ্যতে দেশ আরো বড় সংকটে পড়বে। একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অপপ্রচার মোকাবিলায় ফ্যাক্ট চেকিং ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহারে সাংবাদিকদের দক্ষতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

শুক্রবার দুপুরে রাজশাহীতে সমাজসেবা অধিদফতরের সভাকক্ষে রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়নের (আরইউজে) তত্ত্বাবধানে এবং প্রেস ইনস্টিটিউট বাংলাদেশ (পিআইবি) আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ‘এআই ও ফ্যাক্ট চেকিং' বিষয়ক প্রশিক্ষণ কর্মশালার সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। পরে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সাংবাদিকদের হাতে সনদপত্র তুলে দেন পিআইবি মহাপরিচালক।

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মুহাম্মদ আব্দুল আউয়াল। এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহা. সবুর আলী। অনুষ্ঠানে আরো বক্তব্য দেন বিএফইউজের সহকারী মহাসচিব ড. সাদিকুল ইসলাম স্বপন, পিআইবির প্রশিক্ষক জিলহাজ উদ্দিন নিপুন এবং দৈনিক রাজশাহী সংবাদ পত্রিকার প্রধান সম্পাদক ডা. নাজিব ওয়াদুদ। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. ডালিম হোসেন শান্ত।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ফারুক ওয়াসিফ বলেন, প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনশীল এই সময়ে সাংবাদিকদেরও প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিজেদের দক্ষতা বাড়াতে হবে। এআই ও ফ্যাক্ট চেকিং সাংবাদিকতার গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক প্রযুক্তি হলেও এগুলোর দায়িত্বশীল ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। বস্তুনিষ্ঠ ও বিশ্বাসযোগ্য সংবাদ প্রকাশের জন্য প্রতিটি তথ্য নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে যাচাই করা অপরিহার্য। ভুয়া তথ্য ও গুজব মোকাবিলায় প্রযুক্তিগত দক্ষতার পাশাপাশি পেশাগত নৈতিকতারও বিকল্প নেই।

তিনি বলেন, সাংবাদিকরা শুধু সংবাদ সংগ্রহ করেন না; তারা সমাজের পর্যবেক্ষক, গবেষক এবং ইতিহাসের দলিল রচনার অংশীদার। তাই সত্য অনুসন্ধান, তথ্য যাচাই ও নৈতিক সাংবাদিকতার চর্চা আরো জোরদার করতে হবে।

সাংবাদিকতার বর্তমান সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে নানা কারণে দেশের সাংবাদিকতা গভীর সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিক উদ্দেশে সাংবাদিকতাকে ব্যবহার করার প্রবণতায় অনেক ক্ষেত্রে সত্য ও মিথ্যার সীমারেখা অস্পষ্ট হয়ে পড়েছে। এ ধরনের প্রবণতাকে তিনি ‘শিকারি সাংবাদিকতা’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, এটি এখন সাংবাদিকতা শিক্ষারও গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়।

ফারুক ওয়াসিফ আরো বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে পড়ার পাশাপাশি কখনও কখনও মূলধারার গণমাধ্যমও স্বার্থান্বেষী মহলের প্রভাবে ভুল তথ্য প্রকাশ করছে। এর পেছনে ‘কনফার্মেশন বায়াস’ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। মানুষ আগে থেকেই যে ধারণা বিশ্বাস করে, সেটিকেই সহজে সত্য হিসেবে গ্রহণ ও প্রচার করে। ফলে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং বিশেষ করে নারী নেত্রীরা অপপ্রচারের শিকার হচ্ছেন।

সরকারের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সাংবাদিকদের দক্ষতা উন্নয়ন, প্রশিক্ষণ, কল্যাণ এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে সক্ষমতা বৃদ্ধির বিভিন্ন কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগের যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে সাংবাদিকরা আরো দক্ষতা ও পেশাদারিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন। একই সঙ্গে গণমাধ্যমের স্বাধীনতা, দায়িত্বশীলতা এবং বস্তুনিষ্ঠ সংবাদ পরিবেশনের পরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি।

তিনি জানান, প্রায় ২০ বছর নতুন নিয়োগ না হলেও নিজস্ব জনবল দিয়ে পিআইবি সারা দেশে সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণ দিয়ে যাচ্ছে। ইতোমধ্যে প্রায় ৬০টি জেলায় প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতে পিআইবিকে একটি একাডেমিক এক্সিলেন্স সেন্টারে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে, যেখানে মাস্টার্স, ডিপ্লোমা ও সার্টিফিকেট কোর্স চালু করা হবে।

সাংবাদিকতার ভাষা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সহজ ও সরল বাংলায় লেখা সংবাদই সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য। তথ্যের পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ মতামত, মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি ও শক্তিশালী বয়ান একটি প্রতিবেদনকে আরো সমৃদ্ধ করে।

কার্টুন বিতর্ক প্রসঙ্গে ফারুক ওয়াসিফ বলেন, শৈল্পিক স্বাধীনতার সঙ্গে জবাবদিহিতাও থাকতে হবে। ক্ষমতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে কার্টুন হতে পারে, তবে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে লক্ষ্য করে বিভ্রান্তিকর বয়ান তৈরি করা নৈতিক সাংবাদিকতার পরিপন্থী।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মোহা. সবুর আলী বলেন, তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান বিশ্বে দ্রুত ও নির্ভুল তথ্য পরিবেশনের জন্য সাংবাদিকদের নিয়মিত প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন করতে হবে। ভুয়া তথ্য ও গুজব প্রতিরোধে ফ্যাক্ট চেকিং এখন সময়ের অপরিহার্য দক্ষতা। প্রশাসন ও গণমাধ্যমের পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে তথ্যভিত্তিক, দায়িত্বশীল ও জনকল্যাণমুখী সাংবাদিকতা আরো শক্তিশালী হবে।

সভাপতির বক্তব্যে রাজশাহী সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি মুহাম্মদ আব্দুল আউয়াল বলেন, প্রযুক্তিনির্ভর বর্তমান সময়ে সাংবাদিকদের দক্ষতা বৃদ্ধির কোনো বিকল্প নেই। এআই ও ফ্যাক্ট চেকিং বিষয়ে অর্জিত জ্ঞান দায়িত্বশীল ও নির্ভুল সংবাদ পরিবেশনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। এই প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতা কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগের মাধ্যমে গণমাধ্যমের প্রতি মানুষের আস্থা আরো সুদৃঢ় হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

পিআইবির প্রশিক্ষক জিলহাজ উদ্দিন নিপুন বলেন, এআই সাংবাদিকের বিকল্প নয়; বরং তথ্য অনুসন্ধান, বিশ্লেষণ ও সংবাদ প্রস্তুতিতে এটি কার্যকর সহায়ক প্রযুক্তি। তবে এআই থেকে পাওয়া প্রতিটি তথ্য নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে যাচাই করেই সংবাদ প্রকাশ করতে হবে।

তিন দিনব্যাপী এই প্রশিক্ষণ কর্মশালায় জেলার বিভিন্ন প্রিন্ট, টেলিভিশন, বেতার ও অনলাইন গণমাধ্যমের ৪০ জন সাংবাদিক অংশ নেন। প্রশিক্ষণে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মৌলিক ধারণা, সাংবাদিকতায় এআইয়ের দায়িত্বশীল ব্যবহার, কার্যকর প্রম্পট ইঞ্জিনিয়ারিং, সংবাদ লেখা, তথ্য বিশ্লেষণ, অনুবাদ, সারসংক্ষেপ তৈরি এবং অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এআই ব্যবহারের ওপর হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। পাশাপাশি ছবি ও ভিডিও যাচাই, রিভার্স ইমেজ সার্চ, ওপেন সোর্স ইন্টেলিজেন্স (ওএসআইএনটি), মেটাডেটা বিশ্লেষণ, জিওলোকেশন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভুয়া তথ্য শনাক্ত ও যাচাইয়ের আধুনিক কৌশল শেখানো হয়। এছাড়া সাংবাদিকতায় এআই ব্যবহারের নৈতিকতা, কপিরাইট, তথ্যের গোপনীয়তা এবং দায়িত্বশীল প্রযুক্তি ব্যবহারের বিষয়েও বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়।