স্টাফ রিপোর্টার : জুলাই অভ্যুত্থানের ‘রাজনৈতিক ও দার্শনিক’ সারমর্ম অনুধাবনে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি সরকারের ‘কার্পণ্য অথবা অবজ্ঞা’ দেখছে নাগরিক সংগঠন সুশাসনের জন্য নাগরিক-সুজন। বেসরকারি সংস্থাটি বলছে, জুলাই অভ্যুত্থানের প্রতি ‘অবজ্ঞা প্রদর্শন’ করে গণভোটের রায় বাস্তবায়নে ‘গড়িমসি’ সরকারের অনেক বস্তুগত সাফল্য ম্লান করে দিতে পারে। তবে নির্বাচনী ইশতেহারের কয়েকটি অগ্রাধিকার সম্ভাব্য দ্রুততম সময়ে বাস্তবায়নের প্রক্রিয়া শুরু করাকে বিএনপি সরকারের প্রথম চার মাসের সবচেয়ে ‘বড় সাফল্য’ হিসেবে দেখছে সুজন।

গতকাল রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবে সুজন আয়োজিত এক গোলটেবিল আলোচনায় এ মতামত তুলে ধরা হয়। বৈঠক সঞ্চালনা করেন সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার। গত ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে গত ১৭ ফেব্রুয়ারি সরকার গঠন করে বিএনপি। সরকারের চার মাসের সাফল্য-ব্যর্থতার খতিয়ান তুলে ধরতে সুজন এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

সুজন সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ১৯৭২ সালের সংবিধান অনুসরণ করলে জাতীয় নির্বাচন হওয়া উচিত ২০২৯ সালে। গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণের রায়ের ভিত্তিতে ১৯৭২ সালের সংবিধানের অনেক বিষয় ‘কার্যত পরিবর্তিত’ হয়ে গেছে।

তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার শাসনব্যবস্থায় স্বৈরাচারী সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় ব্যাপকভাবে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ভেঙে পড়ে, প্রায় সব প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণ হয় এবং জনগণের ভোটাধিকার ও বাকস্বাধীনতা হরণ করা হয়েছিল। এই দুঃসহ পরিস্থিতি থেকে মুক্তির লক্ষ্যেই গণঅভ্যুত্থান সংঘটিত হয়। জনগণ একটি পরিবর্তিত ব্যবস্থা চেয়েছিল, যা থেকেই গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা দেখা দেয়।

সুজন সম্পাদক বলেন, সংস্কারের উদ্দেশ্য হল, পুরোনো পথে আর না হাঁটা, কোনো গন্তব্যে পৌঁছাতে চাইলে সঠিক পথে যাত্রা করতে হয়। পুরোনো পথে হাঁটলে নতুন গন্তব্যে পৌঁছানো সম্ভব নয়; বরং পুরোনো গন্তব্যেই ফিরে যেতে হয়।

লিখিত বক্তব্যে সুজনের কেন্দ্রীয় সমন্বয়কারী দিলীপ কুমার সরকার বলেন, বিদ্যমান আর্থিক বাস্তবতায় সরকার লাখ লাখ বেকার তরুণের কর্মসংস্থানসহ মোটামুটি মানসম্মত জীবন ধারণের স্বপ্ন বাস্তবায়নের বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। তাই তরুণ সমাজের সমর্থন ও আনুগত্য ধরে রাখতে তার (তারেক রহমানের) সরকারকে অবশ্যই গণঅভ্যুত্থানের মূল বিষয়গুলোর প্রতি যতœবান হতে হবে বলে আমরা মনে করি।

দিলীপ কুমার বলেন, চার মাসে সরকার যদি জুলাই সনদ বাস্তবায়নে আন্তরিকতা, সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়ন, মেধাভিত্তিক নিয়োগ, ব্যাংকিংখাতে কঠোর পুনর্গঠন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক পদক্ষেপ, সংযমী অর্থনীতি ও ব্যবসাবান্ধব রাজস্ব নীতি, নারীর ক্ষমতায়ন, স্থানীয় সরকার শক্তিশালীকরণ, স্বাস্থ্য সেবা সম্প্রসারণ এবং গণতান্ত্রিক সহনশীলতায় দৃষ্টি স্থাপন করতে পারত, তবে আমরা বলতে পারতাম যে, সরকার সঠিক পথে যাত্রা শুরু করেছে।

সুজন মনে কওে, প্রথম ১২০ দিনে সরকারের আচরণে দেখা যায় সংস্কার প্রশ্নে ব্যর্থতা, নিয়োগে দলীয় আনুগত্য, ব্যাংকিংখাতে আপস, বাজেটে অবাস্তব রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর রাজনৈতিক ব্যবহার, দুর্নীতির বিরুদ্ধে নির্বাচিত পদক্ষেপ এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে অনীহা। সেটি ভবিষ্যতের জন্য উদ্বেগজনক। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সরকার পরিবর্তন যথেষ্ট নয় বরং ‘শাসন ব্যবস্থার চরিত্র’ পরিবর্তন প্রয়োজন বলে মনে করে সুজন।

লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, এই সরকার যদি বুঝতে পারে যে ৫ অগাস্টের গণঅভ্যুত্থান কোনো একক দলের ক্ষমতা আরোহণের সিঁড়ি ছিল না বরং রাষ্ট্রকে নতুনভাবে গড়ার ঐতিহাসিক ডাক ছিল; তাহলে প্রথম ১২০ দিন ভবিষ্যৎ পরিবর্তনের সূচনা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। আর যদি সেই ডাক উপেক্ষিত হয়, তবে প্রত্যাশা দ্রুত হতাশায় পরিণত হবে; যা কোনো নির্বাচিত গণতান্ত্রিক সরকারের জন্য শুভ লক্ষণ নয়।

দিলীপ কুমার সরকার বলেন, সরকারের প্রথম চার মাসে প্রবৃদ্ধির হার ইতিহাসের সর্বনি¤œ পর্যায়ে ও বেকারত্বের হার ৪ দশমিক ৭ ভাগ ছিল। তিনি মুদ্রাস্ফীতি দ্রুত নিয়ন্ত্রণের আহ্বান জানান।

ব্যাংক খাত পুনর্গঠন কঠিন কিন্তু অপরিহার্য মন্তব্য করে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, এটা করতে হবে। কেননা এর আগের সরকার আমরা দেখেছি যে ব্যাংক খাতকে সম্পূর্ণ ধ্বংসের পথে নিয়ে গিয়েছিল। এখন পর্যন্ত এ সরকার চেষ্টা করেছে, ব্যাংকিং খাত পুনর্গঠনের সাহস নিয়েছে। কিন্তু আমরা আশাযোগ দেখছি না। বিশেষ করে ইসলামী ব্যাংকের যে ঘটনা প্রবাহ আমরা দেখছি, তাতে করে এখানে হতাশ হওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে।”

দুর্নীতিবিরোধী লড়াই ও প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠন গণতান্ত্রিক সরকারের অন্যতম প্রতিশ্রুতি হওয়া উচিত বলেও মনে করে বেসরকারি সংস্থাটি।লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, “দুর্নীতি দমন কমিশন, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ এক্সচেঞ্জ কমিশনসহ গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে নিয়োগ ও সংস্কার সরকারের চরিত্র বোঝার উপায় বলে আমরা মনে করছি।”

চলতি অর্থবছরে প্রায় ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ঘাটতির আশঙ্কা দেশের আর্থিক ব্যবস্থাপনার ‘গভীর দুর্বলতা’ নির্দেশ করে বলে মন্তব্য করে সরকারকে ব্যয়নীতিতে সংযমী হওয়ার আহ্বান জানিয়েছে সুজন। দীলিপ কুমার বলেন, এ সরকারের কাছে যে বড় প্রত্যাশাগুলো ছিল, তার একটি ছিল রাষ্ট্রযন্ত্রের ‘রাজনৈতিক অপব্যবহারের অবসান’।

তিনি বলেন, “সরকার কি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার বাস্তব কোনো পদক্ষেপ নিয়েছে? এ জন্য প্রয়োজন স্বাধীন অভিযোগ তদন্ত ব্যবস্থা, হেফাজত নির্যাতন বন্ধে কঠোরনীতি, রাজনৈতিক মামলার অপব্যবহার বন্ধ, পুলিশ সংস্কার, বিচার বহির্ভূত আচরণের বিরুদ্ধে শূন্য সহনশীলতা এবং প্রশাসনিক বদলিতে স্বচ্ছতা।”

জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধির ফলে মুদ্রাস্ফীতি আরো তীব্র হওয়ার কথা তুলে ধরে লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, সরকারের প্রথম ১২০ দিনে জ্বালানি ঝুঁকি মোকাবেলার প্রস্তুতি ছিল কিনা তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি সরকার জ্বালানি প্রশ্নে কেবল মূল্য সমন্বয়ের উপর নির্ভর করে, তাহলে জনগণের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়বেই। কিন্তু সরকার যদি দক্ষতা, সাশ্রয়, স্বচ্ছতা ও দীর্ঘমেয়াদী জ্বালানি নিরাপত্তাকে একসঙ্গে বিবেচনা করে, তবে তা পরিণত নেতৃত্বের লক্ষণ হবে।ভূরাজনৈতিক বিষয়ে সরকারকে ভারসাম্যপূর্ণ, মর্যাদাপূর্ণ, বাস্তববাদী, কূটনৈতিক নীতি অনুসরণ করার পরামর্শ দিচ্ছে সুজন।

লিখিত বক্তব্যে সরকারের ১২০ দিনের মূল্যায়ন তুলে ধরে বলা হয়,সরকার মোটামুটি সহনশীলতা ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি প্রদর্শনে সক্ষম হয়েছে। যদিও জাতীয় সংসদে সরকারি দলের কোনো কোনো সদস্যকে বিরোধীদলের উদ্দেশ্যে কঠোর ভাষা প্রয়োগ করতে দেখা গেছে।